নওগাঁর শহীদ মিনার নেই অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

প্রকাশিত
নওগাঁ সংবাদদাতা: রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পার করেছে ৬৬ বছর। ২১ ফেব্রুয়ারিকে (৮ই ফাল্গুন) ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০০০ সাল থেকে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এ দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরালিয়ন দেশে আজ আমাদের এই বাংলা ভাষাকে তারা দ্বিতীয় প্রধান ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা হয় না এই বাংলা ভাষাকে। শুধু ফেব্রুয়ারী মাস এলেই আমরা মৌসুম ভিত্তিক আলাপচারিতায় মেতে উঠি। এরপর আর খোঁজ থাকে না এই মাতৃভাষার।
শহীদ মিনার নেই নওগাঁর বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফলে শহীদ মিনার না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস ও গুরুত্ব, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। আর সংশ্লিষ্টরা শহীদ মিনার না থাকার কারণ হিসাবে অর্থ সংকট ও সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ না করাকে দায়ী করছেন । ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন নওগাঁর সচেতন মহল।
সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি মোট ৮শত ৫৫টি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৪শত ৪৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শহীদ মিনার থেকে বঞ্চিত। যার অধিকাংশ মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৩৬৮টি। এরমধ্যে শহীদ মিনার আছে ১শত ৩টি বিদ্যালয়ে।
শহীদ মিনার নির্মাণে সবচেয়ে উপেক্ষিত মাদ্রাসাগুলো। আমাদের মায়ের ভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠিত করেছে। অথচ সেই সব ভাষা শহীদদের স্মরণ করার জন্য পর্যাপ্ত শহীদ স্মৃতি নির্মিত হয়নি। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি পেলেও এর ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা নেয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। এদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের উদ্যোগে কলা গাছ, বাঁশ, কাঠ ও কাগজ দিয়ে অস্থায়ী ভাবে শহীদ মিনার তৈরী করে সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। শহীদ মিনার না থাকার কারণে গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ থাকে। ফলে নীরবে নিভৃতেই পেরিয়ে যায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো তাৎপর্যপূর্ণ একটি মহান দিন। আবার যে সব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে সেগুলোও সংস্কার না করায় দীর্ঘদিনের জরাজীর্নতার কারণে সৌন্দর্য হারাতে বসেছে।
একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জানায়, ২১ শে ফেব্রুয়ারী দিন সকালে স্কুলে খালি পায়ে এসে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া হয়। কিন্তু কেন ফুল দিতে হয়, তার ইতিকথা তাদের তেমন জানা নেই। এছাড়া রচনা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগীতাও হয়ে থাকে।
জেলার বদলগাছী উপজেলার চাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, বিদ্যালয়টি বেসরকারি ছিল। পরবর্তীতে সরকারিকরণ করা হয়। বিদ্যালয়টির জন্মলগ্ন থেকে শহীদ মিনার নেই। ২১শে ফেব্রুয়ারীতে আগের দিন কলাগাছ, বাঁশ ও কাঁদা মাটি দিয়ে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার তৈরী করে পুষ্পস্তাবক অর্পণ করা হয়।
মান্দা উপজেলার জাফরাবাদ আদর্শ দাখিল মাদ্রাসা সুপার মোখলেছুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও আলোচনা করা হয়।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার হারুন অর রশিদ বলেন, ভাষার জন্য আমাদের আত্মত্যাগ রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকলে নতুন প্রজন্মরা বুঝতে পারবে প্রতীকটা কিসের এবং এর গুরত্বটা কি? ভাষা আন্দোলনের কারণে যারা শহীদ হয়েছেন শহীদ মিনার দেখে তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাবে। এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শহীদ মিনার স্থাপন করা উচিত। এছাড়া অনেক শহীদ মিনার অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেগুলো সংস্কার হওয়া দরকার।
নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম মোসলেম উদ্দিন বলেন, জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই তাদের অধিকাংশই মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীদের সহযোগীতায় যেন শহীদ মিনার তৈরী করতে পারে এজন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।