নদীগর্ভে চলে যাওয়া বিদ্যালয়টির নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে না জায়গার অভাবে

প্রকাশিত

গোলাম আযম সরকার, পীরগাছা(রংপুর):

কিছুদিন আগেও এখানে বসতি ছিল, ছিল কোলাহল। ছিল সবুজের সমারোহ। ছিল একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিশু শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। অথচ এসব আজ শুধুই স্মৃতি।২০১৭ সালের আগষ্ট মানের বণ্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সবকিছু। এলাকাবাসী ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বালুর বস্তা ফেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের পূর্ব শিবদেব চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। বর্তমানে পাশের বাজারের একটি টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে চলছে ২০০ শিক্ষার্থীর ক্লাস।
গত বছরে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার শিবদেব চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তিস্তার গর্ভে চলে যায। সে সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো: রফিক-উজ-জামান, উপজেলা প্রকৌশলী মো:নুরুল ইসলাম, সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো:ইয়াকুবুল আজাদ, ইউ,পি চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম প্রমুখ। বিদ্যালয়টিকে নদী গর্ভে বিলিন হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য ওই সময় এলাকাবাসী উপজেলা পরিষদ এবং প্রসাশনের ৫/৬ হাজার খালী বস্তায় বালিও মাটি দিয়ে ভাঙ্গন রোধ করার চেষ্টা চালিয়ে বিদ্যালয়টি রক্ষা করতে পারে নি।
ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ নুরুল ইসলাম এর নেতৃত্বে স্থানীয় মশিয়ার রহমান,জাহিদুল ইসলাম, সুবার আলী সহ এলাকার অনেকেই বিদ্যালয়ের ঘরটি বাচাঁতে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করলেও শেষ সময় পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি। এলাকাবাসি বিদ্যালয়টিকে রক্ষা করার জন্য বিনা পারিশ্রমিকে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে কাজ করেছিলেন ।
সেই সময় পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ আফছার আলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আমিনুল ইসলাম এলাকাবাসির সেচছাশ্রমে এই বস্থাগুলো দিয়ে বাধঁ নির্মাণ করার চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী মো: নুরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন বিদ্যালয়টির ভবন ইউ,এস,এইচ প্রকল্পোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়ে ছিল। এলজিইড মাধ্যমে নয়।
শিক্ষা অফিসার মো: রফিক-উজ-জামান বলেন, ওই বিদ্যালয়টি চরাঞ্চলে হলেও এবারের সমাপনি পরীক্ষায় শতভাগ পাশ করেছে, বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার মান অনেক ভাল, আমরা নতুন ভবন তৈরি করার জন্য উদ্ধর্তন কতৃপক্ষকে বলেছি , বিদ্যালয়টি জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে , জায়গা পাওয়া গেলে নতুন ভবন তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, তিস্তায় ডুবে যাওয়া ভবনটি নিলামে উঠানোর জন্য সব ধরনের ব্যবস্খা গ্রহণ করা হয়েছে, নদীতে পানি থাকার কারনে নিলামে উঠানো যাচ্ছে না, পানি কমানোর সাথে সাথে ভবনটি নিলামে উঠানো হবে। বর্তমানে পীরগাছা উপজেলা পরিষদের খাস জমিতে বিদ্যালয়ের একটি টিনসেট ভবন তৈরি করা হয়েছে, সেই টিন সেট দেওয়া ভবনে পাঠদান চলছে।
শিবদেব চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আইয়ুব আলী বলেন, বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে ২২০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহন করছেন। ২০১৩ সালে কয়েক কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মাণ করা হয় এই দ্বিতলা ভবনটি এবং ২০১৪ সালে এই ভবনে আমরা পাঠদান শুরু করি। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রয়েল, লাবনী সহ অনেকে বলেন আমরা আগে বিদ্যালয় ভবনে ক্লাস করলেও বর্তমানে টিনসেটে ক্লাস করছি যা আমাদেরকে ভাল লাগে না। আমাদের এই বিদ্যালয়টি বিল্ডং করা হলে ভাল লাগতো এবং ক্লাস করতে মজা পাইতাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতে পানি কমে যাওয়ায় তিস্তার গর্ভে বিলীন হওয়া বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবনটির সামান্য অংশ ভেসে উঠেছে। গত বন্যায় তিস্তার তীব্র ভাঙনের কবলে পড়ে তীর থেকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে তলিয়ে যায় বিদ্যালয়টি। এতো দিন এর অস্তিত্ব দৃশ্যমান ছিল না। এখন ভেসে ওঠা বিদ্যালয়ের একাংশ দেখার জন্য উত্সুক দর্শনার্থীদেরও ভীড় লেগেই আছে।
বিদ্যালয় থেকে চেয়ার, টেবিল ও আসবাবপত্র আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মাঝে বেশ কিছুদিন বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় নয়ারহাট বাজারে তরকারি বিক্রির একটি শেডে শিক্ষার্থীদের ক্লাস চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেডটিতে জায়গা না হওয়ায় শিক্ষকদের নিজস্ব অর্থায়নে পাশেই একটি টিনের ঘর তুলে চারপাশে পুরোনো টিনের বেড়া দিয়ে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। সেখানেই এখন গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। উপজেলা শিক্ষা অফিস ভবন তৈরি করা জন্য চাহিদা প্রেরণ করলেও ভবন থৈরি করার জন্য জমি না থাকার কারনে নতুন ভবন তৈরি করা করতে পারছে না। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে এই ভবনে পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে তিনজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী জানায়, ‘আমাদের চোখের সামনে প্রিয় স্কুলটি নদীতে তলিয়ে গেছে।’
পূর্ব শিবদেব চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, গতবছরের ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যালয় ভবনটি ভাঙনের কবলে পড়ে। এক পর্যায়ে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। নানা সংকটের মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সুরত জামাল মিয়া বলেন, অনেক চেষ্টার পরেও ভাঙনের হাত থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যায়নি। একটি টিনশেড ঘরে এত শিক্ষার্থীর ক্লাস করা খুবই কষ্টকর।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের বিভাগীয় শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, নদীতে ভেঙে যাওয়া বিদ্যালয়গুলো পর্যায়ক্রমে নতুন করে করা হবে।