নরসিংদীতে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা’য় মানুষের উপচেপড়া ভীড়ে সড়-গরম হয়ে উঠেছে

প্রকাশিত

নরসিংদী প্রতিনিধি: নরসিংদীতে শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা শুরু হয়েছে। জেলা শহরের কাউরিয়া পাড়াস্থ মেঘনা নদের তীরঘেঁষা বাউল আখড়াধামে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা শুরু হয়েছে। বিগত শত শত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ঐতিহ্যবাহী এ মেলায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজারো বাউল শিল্পী-ভক্তবৃন্দরা সমবেত হয়েছে। মেলা উপলক্ষ্যে জেলা শহরসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীরা মেঘনার তীরে গ্রাম-বাংলার মানুষের ঐতিহ্যবাহী নানা প্রকার মুখরোচক খাবার ও বিভিন্ন পণ্য-সামগ্রীর স্টল সাজিয়েছে। একদিকে পায়েস-পিঠা সম্বলিত শীতের আমেজ, অপরদিকে শিশু-কিশোরসহ নানাবয়সী দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে মেঘনা তীরে গড়ে উঠা শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা। সপ্তাহব্যাপী এই মেলা ৩০ জানুয়ারী মঙ্গলবার থেকে ৫ ফেব্রুয়ারী সোমবার পর্যন্ত চলবে।
নরসিংদী জেলা শহরের কাউরিয়া পাড়াস্থ মেঘনার তীর ঘেঁষা বাউল ঠাকুরের আখড়াধামের আদি-উৎপত্তি ও মেলা’র প্রারম্ভিক-যাত্রা সম্পর্কিত কোন সুষ্পষ্ট হিসেব না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৭/৮ শত বছর পূর্বে এক বাউল ঠাকুরের আগমন ঘটেছিল। বাউল ঠাকুর নিজেকে শুধু বাউল বলেই পরিচয় দিতেন বলে তার প্রকৃত নাম জানা যায়নি। এরই ধারাবাহিকতায় আগত বাউল ঠাকুরের নামানুসারে মেঘনা নদীর তীরে বাউল আখড়াধামে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কে বা কারা ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা’র প্রারম্ভিক-যাত্রা শুরু করেছিলেন তার প্রকৃত তথ্য অদ্যবদি জানা যায়নি।
বৃটিশ শাসনামল থেকে বর্তমান বাংলাদেশ শাসনামলে স্বর্গীয় ডাক্তার মনিন্দ্র চন্দ্র বাউল ঐতিহ্যবাহী এ মেলার আয়োজন করেছে বলে জানা যায়। তৎকালীন বাউল পরিবারের উত্তরাধিকারীরা পর্যায়ক্রমে এই মেলার আয়োজন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান আয়োজকদের মধ্যে সাধন চন্দ্র বাউল, মৃদুল বাউল মিন্টু, শীর্ষেন্দু বাউল পিন্টু, মলয় বাউল রিন্টু এবং প্রাণেশ কুমার ঝন্টু বাউল অন্যতম। প্রাণেশ কুমার ঝন্টু বাউল বর্তমানে নরসিংদীর বাউল আখড়া বাড়ীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। প্রবীণদের মতে, বাউলদের আদি নিবাস পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় রয়েছে বলে তাদের ধারনা।
নরসিংদী শহরের কাউরিয়াড়াস্থ মেঘনা নদীর র্তীরে খোলা আকাশের নীচে এক মনোরম পরিবেশে এবারও বাউল আখড়াধামে শত শত বছরের পূরনো ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা’কে কেন্দ্র করে ভারতসহ দেশ-বিদেশের বাউল সাধকরা অংশ নিতে সমবেত হয়েছে। সাধনা-ই মূল ধর্ম হিসেবে মরমী বাউল সাধকদের নিকট আখ্যায়িত। আত্মশুদ্ধি আর আত্মমুক্তি লাভে তারা এ মেলায় সমবেত হয়। জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী পূরনো এ আখড়াধামে পূণ্য¯œান, মহাযজ্ঞ ও পূজা-অর্চণার মাধ্যমে আগত বাউল ও পূণ্যার্থীদের আগমন ঘটে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত বাউল সাধকরা শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পূরনো এ আখড়াধামে দেহতত্ব, আধ্যাত্বিক, মানব প্রেমের গানসহ বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকেন।
ঐতিহ্যবাহী পূরনো বাউল মেলাকে নান্দনিক ও আকর্ষনীয় করে তুলতে দেশের বিভিন্ন জেলাসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীরা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবার জিলাপী, সন্দেশ, বার-মিঠাই, চিড়া-দধি, মনাক্কা-মুড়ালি, গুড়ের তৈরি মুড়ি, চিড়ার মোয়া, তিলের তৈরী সন্দেশ, খাস্তা, কদমা, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, খাজা, গজা, নিম্কি, গাজরের হালুয়া, রকমারি খাবার পিঠাসহ খেলনা, গৃহস্থালীর তৈজসপত্র, কাঠের আসবাবপত্র, তৈরি পোশাক, মাটি ও বাঁশ-বেতের তৈরি কারুপণ্য’র দোকানে পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
বাউল বাড়ীর আখড়াধামের তত্ত্বাবধায়ক প্রাণেশ কুমার ঝন্টু বাউল জানায়, বিগত বছরের ন্যায় এবারও ৭/৮ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বাউল সম্প্রদায়ের নিয়মানুযায়ী মাঘী-পূর্ণিমা তিথি’তে বাউল মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। শত বছরের পূরনো এ বাউল মেলা কোন প্রচার-প্রচারনা ব্যতিরেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বয়সী মানুষের অংশগ্রহনে সড়-গরম হয়ে উঠে।