নেত্রকোনার ঐতিহ্য গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি

প্রকাশিত

আসাদ তালুকদার:
কেউ বলেন ‘জাম গোল্লা পেয়ে শ্বশুর করল চটে নালিশ, ইচ্ছে ছিল আনবে জামাই গয়ানাথের বালিশ।’ আবার কেউবা বলেন, ‘দিনে খাওয়া যায়, আর রাতে শিথানে দেয়া যায়’ এর নাম বালিশ। এই বালিশ সেই বালিশ নয়, এটি হচ্ছে নেত্রকোনার গয়ানাথের বালিশ। নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী একটি মিষ্টির নাম বালিশ। গয়ানাথের বালিশ বললে সবাই চেনে। যুগ যুগ ধরে তার ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে। কালের সাক্ষী হয়ে আছে নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি। বালিশ মিষ্টি দেখতে অনেকটা কোল বালিশের মতো। জেলার গন্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা, এমনকি দেশের বাইরেও এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। সুদূর আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা ও সৌদি আরবেও এ মিষ্টির নাম ছড়িয়ে আছে।

শতাধিক বছরের পুরোনো নেত্রকোনার নামকরা ও বিখ্যাত ‘বালিশ মিষ্টি’। এটি স্বাদ, গন্ধ, রং ও আকার-আকৃতিতে অনন্যসাধারণ। একবার মুখে নিলে এর স্বাদ ও গন্ধ মুখে লেগে থাকে, যা সারা জীবন মনে রাখার মতো। ‘গয়ানাথ’ নামক এক কারিগর শতাধিক বছর আগে থেকে এ বিশেষ ধরনের মিষ্টি তৈরি করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সে জন্য একে লোকে গয়ানাথের মিষ্টি ও গয়ানাথের চমচমও বলে থাকে। বালিশ মিষ্টি আকারভেদে একেকটির ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। খাদক না হলে একটি মিষ্টি কখনো একজনে খেয়ে শেষ করতে পারবে না। তবে আগে থেকে অর্ডার দিলে সেটিকে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ছোট-বড় করে তৈরি করে দিতে পারে। মিষ্টি দেখতে মানুষের শোয়ার বালিশের (পিলো) আকার ও আকৃতির হয় বিধায় একে বালিশ মিষ্টি বলা হয়। এ এলাকার একটি রীতি আছে এ রকম যে, সেখানে কোনো বিয়েতে বর তাঁর নতুন শ্বশুরবাড়িতে বালিশ মিষ্টি না নিয়ে গেলে সেখানকার রীতিসিদ্ধ হয় না। বালিশ মিষ্টির দামও খুব বেশি নয়, একেবারে নাগালের মধ্যেই।
সাধারণ যেকোনো মিষ্টির প্রায় সমান দামেই বিক্রি হয় এটি। এলাকার কোনো লোক কোথাও দূর-দূরান্তে কিংবা অন্য জেলায় বেড়াতে গেলে এ মিষ্টির জুড়ি নেই। এ মিষ্টি এখন নেত্রকোনায় একটি নির্দিষ্ট গয়ানাথের দোকান ছাড়াও সেখানকার অনেক দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। কারণ, দেশ স্বাধীনের আগে ১৯৬৯ সালে গয়ানাথ যখন দেশত্যাগ করেন, তখন তাঁর বংশধরদের গোপন রেসিপি ও বানানোর ফর্মুলা শিখিয়ে গিয়েছিলেন। তখন থেকে গয়ানাথের ভাবশিষ্য ও কর্মচারী নিখিল মোদক ওস্তাদের ফর্মুলায় এটি সেই আদি ও অকৃত্রিমভাবে তার গুণগতমান ঠিক রেখে বানিয়ে চলেছেন।


নেত্রকোনায় বেড়াতে এলে রসনাতৃপ্তির জন্য সবাই একবার হলেও বালিশ মিষ্টির কথা মনে করেন। কেউ খেয়ে যান, আবার যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়েও যান প্রিয়জনদের জন্য। আশপাশের জেলা, এমনকি প্রবাসীরা প্রবাসে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সময় নিয়ে যান গয়ানাথের বালিশ।

জানা গেছে, প্রায় ১১০ বছর আগে নেত্রকোনা জেলা শহরের বারহাট্টা রোডে গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী গয়ানাথ ঘোষ নামে এক ব্যক্তি এ মিষ্টি প্রথম তৈরি করেন। বারহাট্টা রোডে তার ছিল ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান। তিনি দুধ দিয়ে অনেক ধরনের মিষ্টি বানাতেন। এসব মিষ্টি কমবেশি সব দোকানিই বানাতে পারত।

গয়ানাথ ঘোষ চিন্তা করলেন নতুন কিছু করার। সে চিন্তা থেকেই দুধের ছানা দিয়ে পরীক্ষা করে মিষ্টির কাঠামো তৈরি করেন। যার আকৃতি দেখতে অন্য মিষ্টির চাইতে অনেকটা বড় এবং অনেকটা কোল বালিশের মতো। দুয়েকজনকে দেখালেন এবং খাওয়ালেন এই মিষ্টি। মানুষ তখন মিষ্টির নাম জানতে চায়। নাম নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন তিনি। পরিবারের লোজনের সঙ্গে আলোচনা করেও নাম ঠিক করতে পালেন না। শেষে চেহারার সঙ্গে মিল রেখে নাম দিলেন বালিশ মিষ্টি। আস্তে আস্তে গয়ানাথের বালিশ নামে পরিচিতি পেল ওই মিষ্টি। সেই থেকে আজ পর্যনÍ দেশ বিদেশে সেই নামেই ছড়িয়ে পড়েছে গয়ানাথের ঐতিহ্যবাহী বালিশ মিষ্টি।

গয়ানাথ ঘোষ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ১৯৬৯ সালে ভারতে চলে যান। চলে যাওয়ার সময় তার সহযোগী নিখিল চন্দ্র মোদক এই মিষ্টি তৈরির দায়িত্ব নেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি বালিশ মিষ্টি তৈরির ধারা অব্যাহত রাখেন। নিখিল চন্দ্র মোদকের মৃত্যুর পর তার তিন ছেলে বাবুল চন্দ্র মোদক, খোকন চন্দ্র মোদক ও সুবল চন্দ্র মোদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আজও তারা বালিশ মিষ্টি তৈরি করে অতীত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।

পুরোনো সেই ছোট্ট দোকান এখন অনেক বড় হয়েছে। মিষ্টি বিক্রি করে তাদের ব্যবসার প্রসারতা বেড়েছে। কারিগররা জানান, বালিশ মিষ্টি তৈরির মূল উপাদান দুধ, চিনি ও ময়দা। প্রথমে দুধ থেকে তৈরি করা হয় ছানা। পরে ছানা ও ময়দা দিয়ে বানানো হয় বালিশ। সবশেষে চিনির রসে ভাজা হয় বালিশ। এ ছাড়া তৈরির সময় বালিশকে মুখরোচক করতে প্রয়োগ করা হয় বিশেষ কলাকৌশল। ব্যবসায়িক স্বার্থে সেসব গোপন কথা জানাতে রাজি নন দোকান মালিক বাবুল চন্দ্র মোদক। পরিবেশনের আগে বালিশের ওপরে এক ধরনের সুস্বাদু ঘন ক্ষীরের (দুধের মালাই) প্রলেপ দেওয়া হয়। প্রথমে ছোট ও বড় দুই সাইজের বালিশ তৈরি করা হতো। দাম ছিল ১০ টাকা ও ২০ টাকা। ৫০ টাকা দামের মিষ্টিও অর্ডার দিয়ে বানাতে হতো। এখন বিক্রি হয় ২০ টাকা ও ৫০ টাকা করে। প্রায় এক কেজি ওজনের একটি মিষ্টি ২০০ টাকা এবং আধা কেজি ওজনের এক পিস মিষ্টি ১০০ টাকায় বিক্রি বিক্রি হয়, যা বিশেষ করে অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় বালিশ তিন দিন এবং শীতের সময় সাত দিন পর্যন্ত এমনিতেই ভালো থাকে।‘গাভির খাঁটি দুধ ছাড়া বালিশ বানানো হলে প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। আমরা স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছ থেকে দুধ কিনে থাকি। আামাদের অন্য কোনো স্থানে শাখা নেই। সঠিক মান ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। বালিশ তৈরির জন্য দুজন কারিগর নিয়মিত কাজ করে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ আসে বালিশ নেওয়ার জন্য। ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত চলে বালিশ বানানোর কাজ।