নৌকায় ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত

নিউজ সিলেট: আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনার জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচনে নৌকায় ভোট চাইলেন।

মঙ্গলবার বিকেলে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় জাতীয় নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয়ের মিশন নিয়ে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণার জনসভায় তিনি একথা বলেন।

নির্বাচনী বছরে টানা তৃতীয় মেয়াদে জয়ের লক্ষ্যে ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটের মাটি থেকে প্রতিবারের মতো এবারও প্রথম জনসভা করেন শেখ হাসিনা। তার আগে  ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র জনপদ বা ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমির বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উদ্বোধন ও ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন।

মঙ্গলবার ১২টার পর থেকে জনসভাকে সফল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে নেতাকর্মীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে মিছিল সহকারে জনসভায় যোগ দেন। নেতাকর্মীরা জয় বাংলা, জয় শেখ হাসিনা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে তোলে জনসভাস্থল।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা জানেন, আমরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে চার বছর মেয়াদ পূর্ণ করে পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছি। সামনে আমাদের জাতীয় নির্বাচন। ২০১৮ সালের শেষের দিকেই নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনকে সামনে নিয়ে আমরা নির্বাচনী প্রচার পাঁচ বছরে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করেছি। আর শুরুটা করলাম সিলেট থেকে। যেখানে হযরত শাহ জালাল, শাহ পরাণের পুণ্যভূমি; সেই সিলেট থেকেই আমরা এই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করছি।

নৌকা মার্কাকে আপনারা এবং বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়েছিল বলেই আজকে বাংলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছে আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ পেটভরে ভাত খাবে, প্রতিটি মানুষ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। প্রতিটি মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। একটি মানুষও দরিদ্র থাকবে না। আমরা জাতির পিতার সেই আদর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এই সিলেটে কোনো ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। আমরা সেই ক্যান্টনমেন্ট নির্মাণ করে দিয়েছি। সার্বিকভাবে উন্নয়নের ব্যাপক কাজ করে দিয়েছি। এই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা একবার চিন্তা করে দেখেন, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না আসত তাহলে এত উন্নয়ন হতো না। উন্নয়নের স্বাদ আপনারা পেতেন না। দেশবাসী পেত না।

বিএনপি-জামায়াতের প্রতি কটাক্ষ করে শেখ হাসিনা বলেন, এসব লুটেরা এলে লুটপাট কের খেত আর সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ ছড়াত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই দেশের উন্নয়ন হয়েছে। তাই আপনাদের কাছে আমাদের আহ্বান, আপনারা অতীতেও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তার স্বাধীনতা পেয়েছে। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আজ বাংলাদেশ সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, সম্মান পেয়েছে। আমরা কথা দিয়েছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। আমরা সেই বিচার করেছি। জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করেছি। আমরা এই দেশে কোনো অন্যায়-অবিচারকে বরদাশত করব না। কোনো জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের স্থান বাংলার মাটিতে হবে না।

পিতা-মাতা, অভিভাবক, ধর্মীয় শিক্ষক, প্রতিটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবার কাছে আমার আবেদন থাকবে, আপনাদের ছেলেমেয়েরা কোথায় যায়, কার সাথে মিশে, কীভাবে চলে? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ছাত্র বেশিদিন অনুপস্থিত কিনা? অনুপস্থিত থাকলে কোথায় আছে? কেন অনুপস্থিত, সেটা বিশেষভাবে দেখতে হবে। আপনারা ছেলেমেয়েদের প্রতি নজর রাখবেন। আপনাদের ছেলেমেয়েরা কোনো বিপথে গেল কিনা? ওই মাদক সেবন জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো পথে যাচ্ছে কিনা? আপনারা মানুষকে সচেতন করেন, এটা ইসলাম ধর্মবিরোধী। ইসলাম জঙ্গিবাদকে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের নামে যারা নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তারা কখনো বেহেশতে যাবে না। কারা দোজখে যাবে। এটা হলো বাস্তবতা। তাই মানুষ হত্যাকে ইসলাম বলে না।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস দূর করতে পেরেছি বলে আজকে সিলেটবাসী শান্তিতে ঘুমাতে পারে। সিলেট একটি শান্তির নগরী। এই শান্তি যেন বজায় থাকে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীর সঙ্গে একসঙ্গে হাত মিলিয়ে পাড়া-মহল্লায়, গ্রামগঞ্জ-ওয়ার্ড প্রতিটি জায়গায় শান্তির পরিবেশ থাকে আপনারা এই বিষয়ে দৃষ্টি দেবেন। আমরা যে উন্নয়ন করে যাচ্ছি যে উন্নয়নের মাধ্যমে একেবারে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা ইনশাল্লাহ এই দেশকে উন্নত করবই করব। এ সময় ২০২১ ও ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, কারণ ভিক্ষুক জাতির কোন ইজ্জত থাকে না; এটা বলেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা ভিক্ষা করে চলতে চাই না। আমরা কারো কাছে হাত পেতে চলতে চাই না। আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে চলতে চাই।

আওয়ামী লীগের চিন্তা-চেতনা আর ওদের চিন্তা-চেতনায় তফাৎটা আপনারাই বিবেচনা করেন। যারা এতিমের টাকা মেরে খায়। যারা জনগণকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে। যারা মানুষকে ধ্বংস করতে জানে, দেশকে ধ্বংস করতে জানে। বাংলাদেশকে পাঁচ পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে তারা কীভাবে একটা দেশের উন্নয়ন করবে? যারা নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে অন্যের কাছে হাত পেতে চলতে চায়।

বাংলাদেশ হাত পেতে চলবে না। বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে চলবে। বাংলাদেশ উন্নত হবে সমৃদ্ধিশালী হবে। বাংলাদেশের মানুষ সবাই বিশ্ব দরবারে সম্মানের সাথে এগিয়ে যাবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামীতে যে নির্বাচন ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে হবে, সেই নির্বাচনেও আমরা আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই। নৌকা সমৃদ্ধির পথ দেখিয়েছে। নৌকা উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা ওয়াদা করেন, হাত তুলে ওয়াদা করেন, নৌকায় ভোট দেবেন আপনারা?

এ সময় জনসমাবেশে আগত দলীয় নেতাকর্মীরা হাত উঁচিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। এ সময় মঞ্চে আসীন নেতারাও চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে থাকেন।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর সিলেটে শেখ হাসিনার তৃতীয় সফর এটি। আর ভোটের বছরের শুরুতে এই সফরের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার আগাম নির্বাচনী প্রচার শুরু হলো।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুতফর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ, দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, আহমদ হোসেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন কামরান আহমদ প্রমুখসহ স্থানীয় সরকার দলীয় এমপিরা।

এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শেখ হেলাল, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, দেলোয়ার হোসেন, নওফেল চৌধুরী, বিপ্লব বড়ুয়া, ইকবাল হোসেন অপু, আনোয়ার হোসেন, এবিএম রিয়াজুল কবির কাওছার, পারভীন জামান কল্পনা, মেরিনা জাহান প্রমুখ।