পুরনো আইনেই নতুন সীমানা

প্রকাশিত

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় সীমানায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে না। কয়েকটি আসনে সামান্য পরিবর্তন এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বহাল থাকছে বিদ্যমান সীমানা। সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করলেও সেই অনুযায়ী তেমন কোনো কাজ হয়নি। ইসির সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই চলতি মাসে সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করে দাবি-আপত্তির জন্য আবেদন চাওয়া হবে।

ইসি ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নতুন আইন করে গত নভেম্বরের মধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের নতুন সীমানার খসড়া তালিকা প্রকাশ করার কথা থাকলেও সেই আইন এখনও চূড়ান্তই হয়নি। তাই এবার বিদ্যমান আইনেই নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু করা হয়েছে। এর আগে ইসি সংসদীয় আসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিলেও এখন বলছে দশম সংসদ নির্বাচনের পর কোনো আদমশুমারি না হওয়ায় এবার সীমানা পুনর্নির্ধারণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামকাওয়াস্তে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ সারলে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে সংবিধান অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সেই হিসাবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। তবে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে নির্বাচন অনুষ্ঠান হলে আরও তিন মাস সময় পাবে ইসি।

ইসির সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো আইনে সীমানা বিন্যাসের কমিশনের নির্দেশনা পাওয়া গেছে।

এ জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করা হচ্ছে। এ কাজে চলতি সপ্তাহেই পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সাবেক যুগ্ম-সচিব লুৎফর রহমান বিশ্বাসকে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও এই কর্মকর্তা সীমানা বিন্যাসে জড়িত ছিলেন।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসির ঘোষিত কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০১৭ সালের জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য আগের নীতিমালা পর্যালোচনা করে একটি নতুন নীতিমালা করা হবে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য আগস্টে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমস (জিআইএস) সংশ্নিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অক্টোবরের মধ্যে নীতিমালার আলোকে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া তালিকা প্রণয়ন করা হবে। নভেম্বরে খসড়া তালিকা প্রকাশ করে দাবি, আপত্তি, সুপারিশ আহ্বান করা হবে। সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বরের মধ্যে আপত্তির বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক শুনানি শেষে সেসব নিষ্পত্তি করে ৩০০ আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। কিন্তু এর কোনোটি হয়নি।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশনার ও সীমানা নির্ধারণ কমিটির প্রধান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরনো আইনে সীমানা পুনর্নির্ধারণে আইনগত কোনো সমস্যা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সম্প্রতি রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিটি সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ম্যাপসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে সংশ্নিষ্টদের অনুরোধ জানায় ওই কমিটি। বৈঠকে অংশ নেওয়া দু’জন কর্মকর্তা জানান, নতুন আইন পাস হওয়ার পর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ তফসিল ঘোষণার অন্তত ছয় মাস আগে সীমানা নির্ধারণ গেজেট জারি করা হয়। আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলেন, নতুন আইনের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। এতে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

সীমানা নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হলে জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়ার ইসির পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটবে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন চাহিদা তো রয়েছেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল বিদ্যমান সীমানা বহাল রাখার প্রস্তাব করেছে। অপরদিকে ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফেরার প্রস্তাব করেছে বিএনপি। তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নিয়ে খসড়া প্রকাশের পর অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং শত শত মামলা জটিলতাসহ নানা ধরনের বিষয় রয়েছে।

ঘোষিত রোডম্যাপে ইসি আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল। এ জন্য তারা নতুন একটি আইনের খসড়াও তৈরি করে। কিন্তু আইন করা নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসি পুরনো পথেই হাঁটছে। অর্থাৎ বিদ্যমান আইনেই এখন তারা সীমানা নির্ধারণ করতে চায়। এতে বর্তমান সীমানায় খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজমুদার বলেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী ইসির কাজ বাস্তবায়ন না হওয়াটা চরম ব্যর্থতার নজির। ইসি তার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে. এম. নুরুল হুদা বলছেন, আগামী নির্বাচনের জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন। এটা তো হতে পারে না। নানাদিক থেকেই এবার সীমানা পুনর্নির্ধারণটা জরুরি ছিল। আদালতের আদেশের কারণে কুমিল্লা-৯ আসন তাদের করতেই হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে যেটা করা হয়েছে সেটা যথার্থ না হওায় এবার জরুরি ছিল। তাছাড়া এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। ইসি নানা টালবাহানা করে পুরনো আইনে নামকাওয়াস্তে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ সারলে এ নিয়ে বিরোধী পক্ষ থেকে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষক এবং স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদ মনে করেন, আইনগতভাবে সীমানা বিন্যাসের বিষয়টি পুরোপুরি ইসির এখতিয়ার। সীমানা নির্ধারণে নির্বাচনের ফল অনেকটাই প্রভাবিত হয়। এ কারণে ইসির দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ ডিসেম্বরে ভোট করতে হলে প্রার্থীদের সময় দিতে হবে। তারা যদি সীমানা পরিবর্তন না করে তাও আগেভাগে জানিয়ে দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে; কেন করা সম্ভব হলো না। কালক্ষেপণ করলে ইসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এ ধরনের বিষয়ে ইসি বিতর্কে জড়ালে মূল নির্বাচন নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠবে।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নেওয়া ইসির কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু ২০১১ সালে একটি আদমশুমারি হলেও গত জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা নির্ধারণে তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু জনসংখ্যার বিচারে সীমানা নির্ধারণ করা হলে শহরে আসন বাড়বে, গ্রামে কমবে। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। এসব মাথায় রেখে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা, এলাকায় মোট আয়তনকে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসন সংখ্যা সীমিত করে দিয়ে আয়তন, ভৌগোলিক অখ তা ও উপজেলা ঠিক রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় আছে।

এ জন্য গত জুলাইয়ে একটি নতুন আইনের খসড়াও তৈরি করেছে ইসি। গত ২৭ আগস্ট খসড়াটি কমিশনের বৈঠকে তোলা হয়। সেদিন ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে এই খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি।

ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, দশম সংসদ নির্বাচনের পর কোনো আদমশুমারি না হওয়ায় এবার সীমানা পুনর্নির্ধারণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কিছু ছিটমহল যুক্ত হওয়া, নতুন কিছু প্রশাসনিক ইউনিট সৃষ্টি নদী ও সমুদ্র ভাঙনের কারণে কোনো কোনো প্রশাসনিক ইউনিটের সম্পূর্ণ বা আংশিক বিলুপ্তি যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক ইউনিটের যথাসম্ভব অখ তা বজায় রাখার স্বার্থে আগামী নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে