পুলিশের উদাসীনতায় বাড়ছে টানাপার্টি-ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম

প্রকাশিত

নিউজ ডেস্ক: একজন দ্রত গতিতে টান দিয়ে নিয়ে যায় হাতে থাকা ল্যাপটপের ব্যাগ। পাশেই ছিল ট্রাফিক পুলিশ বক্স ও পুলিশের চেকপোস্ট। কিন্তু জুলহাসের চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। পেছন থেকে ধাওয়ার করেও ধরা যায়নি ছিনতাইকারীদের। এরপর মামলা নয় জিডি নেয় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ।

শুধু জুলহাস নয়, রাজধানীতে ছিনতাই এখন আতঙ্কের নাম। ছিনতাইকারীদের দৌরাত্মে ব্যাগ যাচ্ছে, মোবাইল যাচ্ছে, ল্যাপটপ যাচ্ছে। যাচ্ছে প্রাণও। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পুলিশের উদাসীনতায় ফের বেড়ে গেছে ছিনকাইকারীদের দৌরাত্ম। পুলিশের চেকপোস্ট কিংবা নামমাত্র টহল কাজে আসছে না। ছিনতাইয়ের পর কেউ মারা গেলেই কেবল মামলা নেয় পুলিশ। নইলে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জিডিতেই বেশি আগ্রহ থানা পুলিশের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন কমিশনার। ছিনতাই বন্ধে টহল পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা এবং পুলিশ ক্যাম্প ও ফাঁড়িগুলোকে সক্রিয় করাসহ ১০ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মাঠ পুলিশকে।

এ ব্যাপারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনা কাম্য নয়। এর মধ্যে এখন ছিনতাইকারীরা নৃশংস হয়ে উঠছে। এর দায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক। ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসলেই কেবল অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাসে ছিনতাইকারীদের হাতে শিশু ও নারীসহ চারজন মারা গেছেন। গত শুক্রবার রাজধানীর পৃথক স্থানে ছিনতাইকারীদের হামলায় মারা যান নারীসহ দুজন। আহত হয়েছেন একজন।

থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার ভোরে ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের মাথায় ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়ায় গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী হেলেনা বেগম। প্রায় একই সময় সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন খুলনার ব্যবসায়ী ইব্রাহিম।

ডিএমপি’র ওয়ারি বিভাগ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ ডিসেম্বর সকালে দয়াগঞ্জ এলাকায় ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে মায়ের কোল থেকে পড়ে প্রাণ হারায় ছয় মাসের শিশু আরাফাত।

গত ৫ ডিসেম্বর একইভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ফরহাদ আলম (৪০)।

গত ৮ অক্টোবর টিকাটুলিতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবু তালহা খন্দকার। ওই ঘটনা রাজধানীসহ দেশব্যাপী চাঞ্চল্য ছড়ায়। চৈতন্য ফেরে পুলিশেও। এরপর পুলিশ-র‌্যাব রাজধানীতে এক রকম ছিনতাইকারী বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ওই মাসেই শতাধিক ছিনতাইকারীকে আটক করে আদালতের নির্দেশনায় জেলে পাঠায় পুলিশ।

এরপর গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক রাতে ছিনতাইকারী চক্রের ৫৬ সদস্যকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন বলেন, ঢাকা শহরে ছিনতাই ও টানাপার্টি চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। একটা বড় অংশ টানাপার্টি। যারা চলন্ত যানবাহন থেকে হ্যাঁচকা টানে ব্যাগ, মোবাইল নিয়ে যায়। এসব টানাপার্টির অধিকাংশ মাদকাসক্ত। আর যেসব ছিনতাইকারী ধরা পড়েছে তারা অর্গানাইজড না।

ছিনতাইয়ের পর মামলা নয় জিডিতে আগ্রহী পুলিশ :
একের পর এক প্রাণহানি ঘটলেও ছিনতাইকারীদের ঠেকাতে পারছে না পুলিশ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাতের বেলা রাজধানীর রাস্তায় টহল পুলিশ দেখা যায় না। কোথাও কোথাও নামমাত্র তল্লাশি চৌকি থাকলেও সেগুলো কাজ করে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক থানার ওসি জানান, পুলিশ যে প্রক্রিয়ায় ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান নথিভুক্ত করে তা অত্যন্ত জটিল। পিআরবি অনুযায়ী চারজনের অধিক ব্যক্তি কারও টাকা ছিনিয়ে নিলে তা ‘ডাকাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হাতেনাতে ছিনতাইকারী গ্রেফতার হলে তা ‘দ্রুত বিচার’ আইনের আওতায় ফেলে নথিভুক্ত করা হয়।

ভুক্তভোগী ব্যক্তি, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই মাসে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত সোয়া ২ শ’ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপি সদরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দু মাসে ছিনতাই ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৫টি।

বেশির ভাগ ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ছিনতাইয়ের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দেয়।

গত ২৬ ডিসেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে মিরপুর বেড়িবাঁধে বিরুলিয়া সেতুর কাছে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইকারী মোটরসাইকেল নিয়ে যান। এরপর ভুক্তভোগী নিজাম উদ্দিন রূপনগর থানায় গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে জিডি করতে বললে ফিরে যান তিনি।

গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে স্থানীয় বাসিন্দা বেলায়েত হোসেনের পেঁয়াজ, রসুন ও আদাভর্তি একটি পিকআপ নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

বেলায়েত হোসেন জানান, রাতের বেলা মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকি কিংবা টহল দেখা যায় না।
গত ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার সাতরাস্তার ব্যস্ত সড়কে দুপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন একজন রিকশাযাত্রী সংবাদ কর্মী। ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা স্বর্ণের আংটি ও মোবাইল ফোন নিয়ে চলে যায়। থানা পুলিশ ওই সংবাদকর্মীর একটা জিডি গ্রহণ করেন।

একই দিন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার আহসান উল্ল্যাহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সন্ধ্যার দিকে একইভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হন একজন কলেজ ছাত্রী।

গত ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২ টার দিকে মালিবাগ রেলগেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব সংলগ্ন রাস্তায় মাথায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এক সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন সেট ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

ওই ছিনতাইয়ের ২০ মিনিট আগে রবিন নামে আরও এক ব্যক্তি একই স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ভুক্তভোগী সংবাদকর্মী শাজাহানপুর থানায় মামলা করতে চাইলেও জিডি নেয় পুলিশ। ওই জিডির তদন্তের কোনো কুল কিনারা হয়নি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, অপরাধ সংঘঠিত হলে মামলা হবে। ছিনতাই কিংবা ডাকাতি যেটাই হোক না কেন ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা পাবেন এটাই স্বাভাবিক। মামলা না হলে তো অপরাধীরা পার পেয়ে যায় সহজেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশসহ প্রত্যেকটি বিভাগ ও ইউনিটকে ছিনতাই ঠেকাতে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।