পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ কমছে না

প্রকাশিত

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, নিরীহ লোকজনকে ফাঁসানো, ঘুষ বাণিজ্য, নারী নির্যাতন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বাড়ছেই। প্রতিদিনই ৬ মহানগর (নবগঠিত রংপুর ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন বাদে) পুলিশ কমিশনার, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার এবং ৮ রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে শত শত অভিযোগ জমা পড়ছে। এ ছাড়া ডাক-কুরিয়ার, ই-মেইল ও মোবাইল ফোনে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি অনেকে ‘আইজিপি কমপ্লেইন মনিটরিং সেল’ ও ‘ডিসিপ্লিন এন্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ (ডিএন্ডপিএস) কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সরাসরি অভিযোগ জানাচ্ছেন। অভিযুক্ত হচ্ছেন কনস্টেবল থেকে শুরু করে ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও। পরে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগকারী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি হচ্ছে। এসব অপরাধের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন ইউনিটের দপ্তর থেকে তিরস্কার থেকে শুরু করে পদোন্নতি ও টাইম স্কেল স্থগিত, পদাবনতি ও চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। অবশ্য অনেক অভিযোগ মিথ্যাও প্রমাণিত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়ানো, ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানো, ঘুষ বাণিজ্য, নানাভাবে হয়রানি, বিয়ের পর স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ না দেয়া ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মামলা দায়েরের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়া, জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধে জড়ানো এবং হুমকি প্রদানসহ নানাবিধ অপকর্মে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে মাদক দিয়ে ফাঁসানো, ঘুষ ও নিরীহ লোকজনকে হয়রানি এবং স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না দেয়ার অভিযোগ বেশি।
ডিএন্ডপিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ১৪ হাজার ৬৫৮ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্ব^র পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৭৭ জনকে (কনস্টেবল থেকে এসআই), ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৩৭ জন এবং এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কনস্টেবল থেকে এসআই পদের ১০ হাজার ৩৯৫ জনকে লঘুদন্ড ও ৩৫৭ জনকে গুরুদন্ড এবং ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ২৯ জনকে লঘুদন্ড ও সাতজনকে গুরুদন্ড দেয়া হয়েছে। আর সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় শাস্তি দেয়া হয়েছে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে। গুরুদন্ডের ন্যূনতম শাস্তি পদাবনতি আর সর্বোচ্চ শাস্তি বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতি। একই সময়ে চাকরিচ্যুত হয়েছেন ২৫ জন। এদিকে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর চালু হয় ‘আইজিপি কমপ্লেইন সেল’। যেখানে এসএমএস (০১৭৬৯৬৯৩৫৩৫ ও ০১৭৬৯৬৯৩৫৩৬) এবং মেইল ([email protected]) করে অভিযোগ করতে পারেন ভুক্তভোগীরা।
সূত্র জানিয়েছে, ‘আইজিপি কমপ্লেইন সেল’ চালুর পর চলতি বছর অভিযোগ বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে মাদক বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একই অভিযোগে কক্সবাজার জেলার ২১ পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাও রয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা মাদক বাণিজ্যে জড়িত থাকায় সম্প্রতি ৩৮৮ জন পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত সেল পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই বাছাই ও তদন্ত করছে।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে দেশের সেবা খাতগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে উল্লেখ করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছে পুলিশ। অবশ্য পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার দুইজন কর্মকর্তা ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, বেতনভাতাসহ নানান ধরনের সুযোগ বাড়িয়েও মাঠ পর্যায়ে পুলিশের দুর্নীতি কমানো যাচ্ছে না। কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার সদস্যরা হরহামেশা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। এ জন্য থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদে ইন্সপেক্টরের বদলে এএসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেও ইন্সপেক্টরদের বাধায় তা থমকে গেছে।
সূত্রমতে, ইয়াবা উদ্ধার নিয়ে কিছু পুলিশ বাণিজ্য করছে। বিশেষ করে ২০ পিসের নিচে ইয়াবা পাওয়া গেলে আদালতের বিচারে ওই ব্যক্তির সাজা হবে তিন বছর বা তার চেয়ে কম। আর ২০ পিসের বেশি ইয়াবা পাওয়া গেলে আদালতের বিচারে ওই ব্যক্তির সাজার হবে সাত বছর বা তার ঊর্ধ্বে। ইয়াবা কম-বেশি রিকভারির (উদ্ধার) কথা বলে টাকা হাতাচ্ছে কিছু পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে পকেটে ইয়াবা দিয়ে নিরীহ লোকজনকে হয়রানির অভিযোগ এখন ভুরিভুরি।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা ভোরের কাগজকে বলেন, পুলিশের যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত একটি রুটিনওয়ার্ক। তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে গ্রহণ করা হয় বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তিনি বলেন, অপরাধ প্রবণতা কমাতে পুলিশ সদস্যদের মোটিভেশনাল ট্রেনিংও দেয়া হচ্ছে। যেখানে অপরাধ করলে সাজা পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।