বন্দী সুচি! মিয়ানমারে সামরিক শাসন, বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া,গণবিক্ষোভের ডাক সুচির

প্রকাশিত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক-

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মিয়ানমারে কয়েক দিন ধরে বেসামরিক সরকার ও প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর দ্বন্দ্ব এবং উত্তেজনার মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি ও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটকের পর দেওয়া হয়েছে জরুরি অবস্থা। ফলে মিয়ানমারের ক্ষমতা এখন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে। ২০১১ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরুর আগ পর্যন্ত অর্ধশতক বছর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শাসনেই ছিল। ফের সেনাশাসনের ফলে আরেক দফায় হুমকিতে পড়ল দেশটির গণতন্ত্র। মিয়ানমারে নতুন এ সেনা অভ্যুত্থানে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্যানুসারে গতকালই নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোররাতের দিক থেকেই রাজধানীতে ফোন লাইনগুলোয় প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। বন্ধ মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। সব ব্যাংক সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) মুখপাত্র মিও নয়েন্ট জানান, ভোরে রাজধানী নেপিদোয় অভিযান চালিয়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়। বিভিন্ন প্রদেশে সেনা সদস্যরা বাসায় বাসায় গিয়ে প্রাদেশিক সরকারপ্রধানদের আটক করছে। যাদের আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে সু চি ছাড়াও প্রেসিডেন্ট উয়িন মিন্ট ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতা আছেন। নিজেও গ্রেফতার হতে পারেন এমন ধারণা করছেন জানিয়ে নয়েন্ট বলেন, ‘আমি আমাদের জনগণকে বলতে চাই চটজলদি প্রতিক্রিয়া জানাবেন না এবং চাই তারা আইন অনুযায়ী কাজ করুক।’ পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। এর কয়েক ঘণ্টা পর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে এক বছরের জন্য দেশে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেওয়া হয়। টেলিভিশনে ওই ঘোষণায় বলা হয়, গত নির্বাচনে ‘জালিয়াতির’ ঘটনায় সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করা হয়েছে। সেনাবাহিনী জরুরি অবস্থা জারি করে ক্ষমতা দিয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে। এর কিছুক্ষণ পর জনবিক্ষোভের ডাক দেন গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি। তাঁর নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের জনগণকে বিক্ষোভ দেখানোর আহ্বান জানানো হয়। সু চি বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশটিতে আবার জান্তা শাসন কায়েমের চেষ্টা করছে। এটি মেনে না নেওয়ার জন্য আমি জনগণের কাছ অনুরোধ জানাই। সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ঐকান্তিক প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানাই।’

জানা যায়, মিয়ানমারের সামরিক শাসনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। গত শতকের অর্ধেক সময়ই সেনাশাসনের নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশটি। সে সময় দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দী করে রাখা হয় সু চিকে। গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অহিংস লড়াইয়ের জন্য ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। এরপর তাঁর দল এনএলডি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে। ২০১০ সালে মুক্তি পান সু চি। ২০১১ সালে শুরু হয় গণতান্ত্রিক সংস্কার। ২০১২ সালের উপনির্বাচনে ৪৫ আসনের মধ্যে ৪৩টিতে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয় সু চির এনএলডি। এরপর ২০১৫ সালের নির্বাচনে এনএলডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। সে সরকারের মেয়াদ শেষে গত বছরের ৮ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে এনএলডি বড় জয় পায়। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যেখানে ৩২২ আসনই যথেষ্ট, সেখানে এনএলডি পায় ৩৪৬ আসন। কিন্তু সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে। নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করলে দেশব্যাপী উত্তেজনা তৈরি হয়।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে জনগণ উদ্বিগ্ন হলেও এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রাস্তায় বিক্ষোভে নামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ছাত্রনেতা সি থু তুন বলেন, ‘আমাদের দেশ একটি পাখির মতো ছিল, যে মাত্র উড়তে শিখছিল। এখন সেনাবাহিনী আমাদের ডানা ভেঙে দিয়েছে।’ ইয়ানকিন জেলার ১৯ বছরের এক তরুণী বলেন, ‘আমি একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। আমি সকাল থেকে দুবার বাজারে গেছি। চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কিনেছি। জানি না কী ঘটছে।’ থেইনি নামে একজন বলেন, ‘আইন অনুযায়ী আমাদের একটি নির্বাচন হয়েছে। জনগণ যাকে পছন্দ করে তাকে ভোট দিয়েছে। আমাদের এখন আইনগত আর কোনো সুরক্ষা রইল না। আমরা খুবই অনিরাপদ বোধ করছি। আতঙ্ক, উদ্বেগের মধ্যে আছি।’ তবে শুধু সেনা অভ্যুত্থানের পক্ষেও কথা বলছেন কেউ কেউ। একজন জাতীয় ভিক্ষু ফেসবুকে এক ভিডিও পোস্টে বলেন, ‘আজ জনগণের খুশির দিন।’

স্থিতিশীলতা বজায় থাকার আশা চীনের : গত মাসে চীনের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং য়ি মিয়ানমার সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই জেনারেলই এখন দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। তাই চীনের প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল বিশ্ব। চীন গতকাল মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়ে দেশটিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গতকাল বেইজিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৈনিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন এমন আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে যা ঘটেছে তা লক্ষ্য করেছি আমরা আর পরিস্থিতি আরও বোঝার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। চীন মিয়ানমারের এক বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী। আমরা আশা করছি মিয়ানমারের সব পক্ষ সংবিধান ও আইনি কাঠামোর অধীনে যথাযথভাবে তাদের পার্থক্যগুলো সামাল দিতে পারবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।’

গভীর উদ্বেগ ভারতের : প্রতিবেশী ভারত মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। গতকাল এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ প্রতিক্রিয়া জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মিয়ানমারে যা ঘটছে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা তা লক্ষ্য করছি। আমরা বিশ্বাস করি আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি আমরা।’

সু চিকে মুক্তিদানের আহ্বান জাপানের : মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চিকে মুক্তি দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে জাপান। গতকাল জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি বিবৃতিতে বলেন, ‘মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারিতে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক রয়েছি। আমরা চাই মিয়ানমারের সামরিক শাসক দ্রুত ক্ষমতাসীন নেত্রী অং সান সু চিকে মুক্তি দেবে। জাপান মিয়ানমারের গণতন্ত্রকে সব সময় সমর্থন করে। আমাদের বিশ্বাস মিয়ানমারের সামরিক সরকার দ্রুত দেশে রাজনীতির চর্চা ফিরিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করবে।’

নির্বাচনের ফল নিয়ে বিরোধ আইনিভাবে মেটাতে বলল জাতিসংঘ : মিয়ানমারের ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস উদ্বিগ্ন জানিয়েছেন তার মুখপাত্র স্টিভেন দুজারিক। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মিয়ানমারের সব পক্ষকেই উসকানিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার ও গণতান্ত্রিক রীতি মেনে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেছেন, ভোটের ফল নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে আইনিভাবেই তা মেটাতে হবে। গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য মিয়ানমারের জনগণের যে আকাক্সক্ষা জাতিসংঘ তার প্রতি সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

সু চিসহ নেতাদের মুক্তিদানের আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের : তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার যে কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবে বাইডেন প্রশাসন। সু চিসহ আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, শান্তি এবং উন্নয়নের প্রতি মিয়ানমার জনগণের যে আকাক্সক্ষা তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। সামরিক বাহিনীর উচিত এখনই তাদের ওই পদক্ষেপ থেকে সরে আসা।

সবাইকে অবিলম্বে মুক্তিদানের আহ্বান অস্ট্রেলিয়ার : অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিজ পেইনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, আইনি প্রক্রিয়ায় বিরোধ মীমাংসা এবং বেসামরিক সব নেতা ও অন্য যাদের বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে তাদের সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।