বরফগলা জলে জীবিকার লড়াই !

প্রকাশিত

 

এস কে দোয়েল, তেঁতুলিয়া :
সীমান্ত নদী মহানন্দা। নদীর এপারে বাংলাদেশ, ওপারেই ভারত। দুই সীমান্তের বুক চিরে প্রবাহিত নদী মহানন্দায় কঠিন শীতেও থেমে নেই হাজারও শ্রমিকের জীবন লড়াই। বরফগলা নদীর জল। কিন্তু পেটের ক্ষুধার কাছে সব বাঁধাই হার মানে। হার মানছে নদীর বরফগলা নদীরও জলও। দেশের উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ায় বইছে শৈতপ্রবাহের সাথে কনকনে হাঁড় কাঁপানো শীত। যেখানে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অনেকেই। ঠান্ডায় উহু উহু করতে বিলাপ করতে হচ্ছে কারও কারও। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোর সকালেই কঠিন বরফগলা জলে পাথর তুলতে নেমে পড়ছে শতশত শ্রমিক। তাদের নদীর নুড়ি পাথরই দৈনন্দিন জীবিকা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করে মহাজনের কাছে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে হাজারও শ্রমিক।

ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে সকালেই দেখা যায় দলবেঁধে শ্রমিকরা কোদাল, চালুনি আর ঢাকি নিয়ে নদীতে নেমে পড়ছেন তারা। একেক দলে ১০ থেকে ১৫ জন। নদীর জলে টিউভ ভাসিয়ে তাতে নুড়ি পাথর তুলে স্তূপ করে। পরে সে পাথর কাঁধে নিয়ে বহন করে নদীর পাড়ে এনে স্তূপ করে। তারপর চালনি দিয়ে ছেঁকে আলাদা করা হয় সাদা-কালো নুড়ি পাথর। সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা খাটুনির পর একজন শ্রমিক ২০-২৫ সিএফটি পাথর তুলতে পারেন। কখনো কম হয়। গড়ে দিন মুজুরি পড়ে ৫শ থেকে ৭শ টাকা। সন্ধ্যায় মহাজনের কাছে বিক্রিলব্ধ অর্থে আহার জোটে স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজনের। এ নুড়ি পাথরেই ঘুরছে জীবিকার চাকা। অন্ন-বস্ত্রসহ মৌলিক চাহিদা জুটছে এ পাথরেই। এই পাথরেই জড়িয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবন।

শনিবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় নদীতে গিয়ে দেখা যায় হাঁড়কাপানো শীতের মধ্যেই পাথর তুলছেন দলবাধা শতশত শ্রমিক। নদীর ১৫-১৮ কিলোমিটার জুড়ে দেখা যায় জলের বুকে শ্রমিকদের কর্মযজ্ঞ। এরকম হিমশীতল জলে কিভাবে পাথর তুলছেন জানতে চাইলে আব্দুল কাদের, আরশেদ আলী, হরমুজ, পিয়ার আলী, মজনু মিয়া, শফিউর, তাইজুল, কামালসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানান, কী করবো ভাই, এ পাথরই আমাদের দৈনন্দিন রুজি-রোজগার। এ রোজগারেই চলে পরিবারের খাদ্য-বস্ত্রসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা। তাই বসে থাকার সুযোগ নাই। আব্দুল কাদের নামে এক শ্রমিক বলেন, পেটের ক্ষুধা তো ঠান্ডা বুঝে না। সন্তানদের লেখা পড়া খরচ, সংসারের খরচ। তিন সন্তানই লেখাপড়া করাচ্ছি। কখনো কখনো পাথর তোলা বন্ধ হয়ে গেলেই পরিবারে নেমে আসে দূর্ভোগ।

সীমান্তঘেষা মহানন্দায় পাথর তুলতে গিয়ে সীমান্তের ওপারে বিএসএফের বাঁধা আসে কীনা বিষয়ে শ্রমিকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, খুব ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাথর তুলতে হয়। জীবিকার এই লড়াইও নিরবচ্ছিন্ন থাকে না ওপারের বিএসএফের কারণে। সীমান্ত টহলদার বাহিনী বিএসএফের বাধা, তাড়া ও কখনো মারধরের ঘটনা ঘটে। কখনো বা তাদের গুলিতে ঝরে কোন হতভাগা শ্রমিকের জীবন। অন্যদিকে পাথর তোলা বন্ধ করে দেয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়, সীমান্ত এ নদী দিয়ে ভারতীয় পণ্য, গরু-মহিষ পাচারকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন সময় বন্ধ করে দেওয়া হয় পাথর উত্তোলন। আর তখনই থমকে যায় শ্রমিকদের জীবিকা নির্বাহের পথ।

জীবিকার তাগিদে বসে নেই কর্মজীবি নারীরাও। তারাও শীতের তীব্র প্রকোপকে উপেক্ষা করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সকাল সকাল। বিভিন্ন পাথর সাইটে কাজ করছেন তারা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা পাথর নেটিং, ভাঙা, লোড-আনলোডের কাজ করছেন তারা। দিনভর হাড়ভাঙ্গা খাটলেও দিনশেষে এসব নারী শ্রমিকদের আঁচলে আসে ৩শ থেকে ৪শ টাকা। শনিবারও নদী মহানন্দার তীরেই মহাজনদের পাথরের সাইটে কাজ করতে দেখা যায়। কথা হয় মর্জিনা, আয়মনা সুফিয়া, কদবানু, শিউলিসহ বেশ কয়েকজন নারীর শ্রমিকের সাথে কথা হলে তারা বলেই উঠেন, পেটের ক্ষুধা কী ঠান্ডা মানে ভাই। ঠান্ডা তো আর ভাত দেবে না। তাই সকাল সকাল কাজে ছুটে এসেছি। আবার সন্ধ্যায় ফিরবো বাড়ি। পরের দিন সকালে আবারও আসবো। এভাবেই চলছে জীবিকার তাগিদে শ্রমিকদের জীবনের লড়াই। যেখানে হার মানছে বরফের শীতও।