বাংলাদেশীরা সিরীয় পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাচ্ছেন

প্রকাশিত

বাংলাদেশী নাগরিক ফেনীর মো. আরিফ হোসেন (ছদ্মনাম)। ২৯ বছর বয়সী এ বাংলাদেশী লিবিয়া হয়ে ইতালি গিয়েছেন ২০১৮ সালের শেষের দিকে। তার সঙ্গে সে সময় প্রায় ৯০ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশী, যারা নিজেদের সিরিয়ান পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

বণিক বার্তাকে মো. আরিফ হোসেন বলেন, আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে সিরিয়ান হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইতালি প্রবেশ করব। আর এটা বাংলাদেশ থেকেই নির্ধারণ করা ছিল। কারণ বাংলাদেশী পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। নির্যাতনের মামলা থেকে শুরু করে সংবাদপত্রে সংবাদসহ নানা ধরনের নথিপত্র জমা দেয়ার বিষয় থাকে।

কী পরিমাণ খরচ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ১১ লাখ টাকা দালালকে দিতে হয়েছে। দালালরাই ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে রুটে সব দেশের পুলিশসহ সবাইকে ম্যানেজ করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়া আর কিছুই বলতে হয়নি। আর ইতালি প্রবেশের আগে এগুলো আমাদের ভালো করে শিখিয়ে নেয়া হয়েছিল। তার করা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনটি এখনো পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানান তিনি।

শুধু মো. আরিফ হোসেন বা তার সঙ্গে ইতালিতে প্রবেশ করা ২৬ বাংলাদেশী নন, গত কয়েক বছর যেসব বাংলাদেশী অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকের বেশিই নিজেদের সিরিয়ান পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এর সত্যতা মিলেছে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনাসংক্রান্ত তথ্যে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে বাংলাদেশী পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন কমেছে ৪১ শতাংশ।

ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে ২০১৯ সালে সবচেয়ে কম বাংলাদেশী ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, ২ হাজার ৯৫১ জন। আর ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৬। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ২০১৭ সালে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, ১২ হাজার ৭৩১ জন। ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশীদের আবেদনের হার কমেছে ৬১ শতাংশ, যা ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধিতে ছিল। ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৫১৭ জন, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৬ ও ২০১৬ সালে ৬ হাজার ৮১৮ জন বাংলাদেশী ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ভূমধ্যসাগরে যেসব বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়, বলতে গেলে তার পুরোটাই ঘটে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে। সম্প্রতি লিবিয়ায় যে ২৬ বাংলাদেশী মারা গেলেন তারা লিবিয়ার উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েননি, বরং ইতালি প্রবেশের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। ইতালিতে একটি আইন রয়েছে যে কেউ ১৮ বছরের নিচে হলে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তিন মাসের ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দেয়। তবে সেই মানুষগুলোর বয়স যাচাইয়ের জন্য পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে তাদের বৈধ পাসপোর্ট দেখাতে হয়। এক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে ১৮ বছর নয়, এমনকি ৪০ বছরেরও বাংলাদেশী নিজেকে ১৬-১৭ বছর দাবি করে ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে যাচ্ছেন। ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে এ মানুষগুলো আসল পাসপোর্ট ফেলে দেন। এরপর এ মানুষগুলো বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে বয়স কমিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করেন।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাসপোর্ট দেয় না। আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে আবেদন করেন। বয়স বেশি হওয়ার পরও যখন ১৬-১৭ বছরের পাসপোর্ট চান, তখন মিশন ঝামেলায় পড়ে যায়। এক্ষেত্রে এ মানুষগুলোর পাসপোর্ট পেতে বেশ বেগ পেতে হয়।

বাংলাদেশীরা খুব চৌকস বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমরা শুনতে পেরেছি যে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যখন তারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন, তখন তাদের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কারণ বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। এখানে কোনো অত্যাচার ও অবিচার নেই। ফলে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে, তারা রাজনৈতিক আশ্রয় পায় না। সে কারণে এমন কিছু করে, যাতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সুবিধা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্কিন দেশে একটি নিয়ম রয়েছে যে কেউ যদি ইহুদি ধর্মের মানুষ হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেই তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনকার্ড ও ওয়ার্ক পারমিট দেয়া হয়। আমাদের বাংলাদেশে কোনো দিন শুনেছেন যে ইহুদি ধর্মের মানুষ রয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশী কিছু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেদের ইহুদি পরিচয় দিয়ে মার্কিন সুবিধা ভোগ করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের মাল্টা, স্পেন, ইতালি ও গ্রিস প্রবেশের জন্য সিরিয়া, আলজেরিয়া ও তুরস্কের উপকূলে বিভিন্ন দেশের নাগরিকের পাশাপাশি বড়সংখ্যক বাংলাদেশীরা অপেক্ষায় রয়েছেন। চলতি বছরে কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে ইউরোপের সব দেশ সীমান্তে নজরদারি কড়াকড়ি করেছে। এরই মধ্যে লিবিয়া, ইতালি ও মাল্টা তাদের বন্দরগুলোকে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অনিরাপদ ঘোষণা করেছে। এর জেরে শতাধিক আশ্রয়প্রার্থী বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সাগরে ভেসে রয়েছে। তাদের উপকূলের কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কোস্টগার্ড। বিষয়টি নজরে রাখলেও এ মানুষগুলোর মানবেতর অবস্থা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে নেয়া হয়নি। ইইউ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, অভিবাসন সংস্থা আইওএম এবং জার্মান এনজিও ‘সি আই’কে সার্বিক পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্যের জন্য জানিয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইতালিতে নৌকায় করে ৫ হাজার ৪৭২ জন অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য গিয়েছেন। আর মাল্টায় পৌঁছেছেন ১ হাজার ৬৯৪ জন। একই সময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে আশ্রয় প্রার্থনায় পৌঁছেছেন ৭ হাজার ৬৯৭ জন এবং গ্রিসে ১০ হাজার ৭৬ জন। চলতি বছরই সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় ১৮৬ জন মারা গিয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বয়স কমিয়ে বলা বা অন্য নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেয়াসহ বিভিন্নভাবে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা থাকে বাংলাদেশীদের। ইতালি যাওয়ার ইচ্ছায় বাংলাদেশে বর্তমানে যারা অবস্থান করছেন শুধু তাদের চিত্রটিই পাওয়া যাবে গুলশান থানায়। প্রতি মাসেই ভুয়া পরিচয় ও কাগজপত্র জমা দিয়ে ভিসা অবেদনের জন্য একাধিক সাধারণ ডায়রি করে থাকেন ঢাকার ইতালির দূতাবাস। এমনকি বাংলাদেশীদের পাসপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয় সত্যতা নিয়ে যে পুলিশি যাচাই হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমালোচনা করেছে ইতালি দূতাবাস।

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাদের ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার কথা ছিল আরো বেশ কয়েক মাস আগেই। তবে কভিড-১৯-এর কারণে সীমান্তে কড়াকড়ি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় যাত্রা করতে পারেনি দলটি। এক পর্যায়ে তারা অধৈর্য হয়ে ওঠে। আর এতগুলো মানুষকে দিনের পর দিন ভরণপোষণে মানব পাচারকারী চক্রেরও খরচ বেড়ে যায়। ফলে দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হলে মানব পাচারকারী চক্রের এক সদস্য মারা গেলে তারা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষগুলোকে মেরে ফেলে।