ভঙ্গিবাজ সাংবাদিকদের কাছে অসহায় পেশাদার অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা

প্রকাশিত

মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা-
এটা একটা পত্রিকা হলো নাকি? ও কিসের সাংবাদিক ? আমি বড় সাংবাদিক !! আমারটা জাতীয় পত্রিকা, ওর টা ছোট পত্রিকা ! ইত্যাদি ।

এসব কথাগুলো সাধারণত চড়িয়ে বেড়ান এ সমাজের বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিকরা । কোন অপরাধীর অপকর্মের সংবাদ কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিক পত্রিকায় প্রকাশ করলেই সাথে সাথে ঐ অপরাধীর কাছে গিয়ে এমন মন্তব্য করে থাকেন তারা ।

কিছু সময় অপরাধীর পাশে বসে এমন মন্তব্য করার পর বলে, এই সংবাদে আপনার কিছুই হবেনা লিডার, আমরা আমাদের অনলাইন ও জাতীয় পত্রিকায় এই সংবাদের প্রতিবাদ ছাপিয়ে দিব । তারপর অপরাধীর কাছ থেকে প্রতিবাদ ছাপানোর বিল বাবদ হাতিয়ে নেন কিছু টাকা । তারপর যে কথা সে কাজ । পরের দিন ঠিকই নাম সর্বস্ব একটি পত্রিকার প্রথম বা শেষের পাতার অর্ধেক অংশ জুড়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির প্রতিবাদ ছেপে কয়েক কপি পত্রিকা নিয়ে হাজির হন ঐ অপরাধীর নিকট । আবারো হাতিয়ে নেন কিছু অর্থ । আর ঐ জ্ঞানহীন অপরাধীর কাছে বনে যান বড় সাংবাদিক । কিন্তু এই জ্ঞানহীন অপরাধী ও ভঙ্গিবাজ সাংবাদিক সাহেবরা জানেন না যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির অনুসন্ধান কিন্তু রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট শাখায় নিয়োজিত কর্তাগণ ঠিকই করেন এবং সময় মত ঐ অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন । বর্তমানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রতিবাদ ছাপানোর যেন হিড়িক পড়ে গেছে । এই বেশভূষা সাংবাদিকের দল জানে না যে একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের কত সময় ব্যয় করতে হয়, কত কষ্ট করে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয় । তারপর সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর অনেক সময় ঐ অনুসন্ধানী প্রতিবেদককে কত হামলা মামলার শিকার হতে হয় । আর এই হামলা মামলাকে উপেক্ষা করে এবং অনেক পরিশ্রম করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ।

কিন্তু ঐ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি মিথ্যা প্রমাণ করতে ও ঐ প্রতিবেদককে বিভিন্ন রকম হামলা এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর জন্য কম করে হলেও ৪০জন বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিকরা উঠে পড়ে লাগেন । এমনকি ঐ অপরাধীর পা চাটতেও দ্বিধা বোধ করেন না । তাই বিগত দিনের চাইতে বর্তমান সময়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে । আর এই কঠিন হয়ে পড়ার বড় একটি কারন বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ, নামধারী কথিত সাংবাদিকরা বলে মন্তব্য করেছেন অনেক বিজ্ঞজনেরা । কয়েকদিন আগে আমি আমার ফেসবুকে একটা পোস্ট করেছিলাম যে “১টি পত্রিকায় কোন বিষয় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর, অপর ১টি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটির প্রতিবাদ দেওয়া আইন সম্মত কিনা-পরামর্শ চাই…” সেখানে অনেকেই মন্তব্য করেছেন এমন কি অনেক আইন বিশেষজ্ঞরা আমাকে ম্যাসেঞ্জারে আইনি ভাষায় উত্তর দিয়েছেন । তাদের উত্তর একটাই-প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোন অসত্য বা ভুল তথ্য প্রকাশ হলে কেবল সেই পত্রিকাই ভুল বা অসত্য অংশের প্রতিবাদ ছাপালে সেটা আইনি দৃষ্টিতে বিবেচ্য, অন্য পত্রিকায় ছাপালে সেটা নিশ্চয় আইন সম্মত নয় ।

আমার দৃষ্টিতে যে মাধ্যম জনগণের চাওয়া-পাওয়া জনগণের নিকট তুলে ধরে আমার কাছে তাই গণমাধ্যম । গণমাধ্যমের কারণেই আমরা মুহূর্তেই জানতে পারি দেশ-বিদেশে কখন কি ঘটছে? জানতে পারি কোথায় কি সমস্যা? একবার ভাবুনতো গণমাধ্যম বন্ধ দিনটি কেমন যাবে? শুধু জনগণই নয় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে থাকা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এই মাধ্যমের মাধ্যমেই জানতে পারে দেশের কোনটা বড় সমস্যা, কোনটা করা জরুরী? এককথায় গণমাধ্যমের মাধ্যমেই সকলে সমস্যা চিহ্নিত করতে পারি এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতে পারি। গণমাধ্যমে যারা কাজ করে তারা গণমাধ্যকর্মী বা সাংবাদিক।

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। একটি বিপদজ্জনক পেশাও বলা যায়। কিন্তু গণমাধ্যমে কোন সংবাদ প্রচার করলে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কাজ করে। দেশে সকল সংকটময় মুহূর্তে গণমাধ্যমকর্মীরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সা¤প্রতিক করোনায় আক্রান্ত হয়ে অনেক মেধাবী সাংবাদিকের প্রাণ অকালে চলে যাওয়া । শুধু রোগ-ব্যাধিতেই না। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট সকল দুর্যোগেই সাংবাদিকরা থাকে সামনের কাতারে। এছাড়া জনদুভোর্গ বিষয়েও সাংবাদিকদের ভূমিকা অবিস্মরনীয়।

যেমন সা¤প্রতিক সময়ে কারা করোনাকালীন চাউল চুরি করছে, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ২৫০০ টাকা বরাদ্দ সঠিকভাবে সবাই পাচ্ছে কি না তা জানতে বা জানাতে পারছি । আদালত বলেন, সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ । এই চতুর্থ স্তম্ভ (সাংবাদিকরা) জেগে থাকলে, তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে রাষ্ট্রের বাকি তিন স্তম্ভ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে । কিন্তু বর্তমানে এই পেশাটি যেন কলঙ্কিত হয়ে পরেছে । এর জন্য দায়ী কিছু বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিক বলে আমি মনে করি ।

বর্তমানে সত্য খবর সত্যভাবে তুলে ধরতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে মতভেদ বা বৈরিতা । সাংবাদিকের শত্রæ হচ্ছে সাংবাদিক। কিন্তু আসলে কি সাংবাদিকের শত্রæ সাংবাদিক? সাংবাদিকের শত্রæ কি সাংবাদিক হওয়া উচিত? কথায় আছে, ঘরের শত্রæকে নিয়ে সংসার করা যায় না । ফলে এই ঘরের শত্রæর কারণে পরের শত্রæরা হচ্ছে শক্তিশালী আর সাংবাদিকতা হচ্ছে কমদামি। সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা অনেক কিন্তু প্রাপ্তির জায়গাতে শূণ্য। জনপ্রতিনিধির কথা ভাবুন । তারা বলবে আমাদের সাংবাদিকরা সঠিক তথ্য তুলে ধরেন না ।

ঠিক পরের দিনই যদি তার কোন অপকর্ম তুলে ধরা যায় তখন তিনি বলবেন সাংবাদিকরা আমার সম্মানহানী করছে । আর হুমকি-ধামকি এটা সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পেশাদার অনেক সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মখীন হয়েছেন। এর অনেক বাস্তবতা আমাদের দেশে সা¤প্রতিক ঘটেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক নির্যাতনের এসব ঘটনা ঘটছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায়। আবার অনেক সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী । তাদের বিরুদ্ধে দিয়েছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ।

এই যে সাংবাদিকদের দৈন্যদসা এর থেকে মুক্তি কিভাবে? সাংবাদিক সংবাদ করবে, মামলা হবে এইটা স্বাভাবিক। কথায় বলে যে পথে দুর্ঘটনা নেই সেই পথ পথ নয় । ইদানিং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেই বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিকদের এমন কিছু সত্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রতিবাদ ছাপানোর ঘটনা অহরহ । তবে এটা আমাদের জন্য চরম দুঃখজনক । সাথে এই মহান পেশার জন্য হুমকিস্বরূপও। আজ আপনি করবেন, কালকে আপনি ভুক্তভোগী হবেন। এভাবেই চলবে আপনাদের নোংড়ামু খেলা, আর অন্যরা হাসবে বলবে দিনের বেলা । আমাদের দেশের অনুসন্ধানী ও পেশাদার সাংবাদিকরা নিশ্চই সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল করতে কাজ করছেন । একজন সাংবাদিকই পারে সমাজের সকল অসঙ্গতি দূর করে একটি দক্ষ, সশিক্ষিত ও দূরদর্শী নেতা তৈরি করতে ।

পারে একটি সমাজের দুষ্কৃতিকারীদের মুখোশ উন্মোচন করে সমাজে সুশৃঙ্খলতা ফিরিয়ে আনতে । তাই আসুন সকলে মিলে বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিকতা দূর করি । দায়বদ্ধতার জায়গা মজবুত করি । গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সমৃদ্ধ করি। আর অবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত সব হামলা-নির্যাতনের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করে এই মহান পেশাকে নিরাপদ করতে, কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে সরকারকে আবেদন করি। আজ এই মহান পেশার আদর্শ উদ্দেশ্য উল্টে ফেলা হচ্ছে, সৎ সাংবাদিকদের বিতর্কিত করা হচ্ছে, নানা স্বার্থে সংবাদপত্রকে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কারা করছে এসব? আজ কেন সাংবাদিকতা বাণিজ্যের ভিড়ে সংবাদপত্র এবং প্রকৃত সাংবাদিকরা অপসৃয়মাণ?

কেন মর্যাদাসম্পন্ন পেশা, মর্যাদা হারাচ্ছে। কেন শুদ্ধতার মাঝে ঢুকে পরেছে নাম সর্বস্ব অপসাংবাদিকতা। দুর্নীতি ঢুকে গেছে এ পেশায়। পেশা নয় অসুস্থ ব্যবসা। অশিক্ষিত, কুশিক্ষিতরা অর্থের বিনিময়ে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে মানুষকে ভয়ভীতি; আর সরলতার সুযোগ নিয়ে হরদম প্রতারণা করছে। যা সাংবাদিকতা আর সংবাদপত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন কিংবা ৫শ’ টাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কার্ড এনে দাপট দেখান তারা আমার এ লেখার কোথাও কোথাও বেশ মজা পেয়েছে তাই না?

এ বিষয় গুলো আপনাদের জন্য নয়। ভুয়া আর হলুদ সাংবাদিকে ভরে গেছে দেশ। এরা সাংবাদিক নয়, সমাজের কীট। এরা মানুষকে বøাকমেইলিং করে টুপাইস কামাচ্ছেন বেশ । এদের কাছ থেকে সবাইকে সাবধান হতে হবে । এদের কারণে, সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, প্রতারক, বøাকমেইলার ও ভীতিকর ব্যক্তি এমন ধারণাই পোষণ করে দেশের গরিষ্ঠ মানুষ । প্রকৃত সাংবাদিকেরা এর কোনটাই নন। সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা।

এটা কেবল পেশা নয়, একজন সাংবাদিক এ সেবায় থেকে মানুষকে সেবা দিতে পারেন । দেশের কিছু অসৎ সম্পাদক, সাংবাদিক অর্থের বিনিময়ে সারা দেশে নানা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দিয়ে এ পেশার সম্মানহানি করছে । এরা সাংবাদিক নন। সাংবাদিক নামধারী। সমস্যাটা এখানেই। দেশে হরেদরে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ আছে । এই সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ আরোপে প্রকৃত সাংবাদিকদের সাহসী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সাংবাদিক হতে কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। হুট করেই সাংবাদিক হয়ে যেতে পারে যে কেউ। না, এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাও কোনো বিষয় নয় ! সুশিক্ষিত ও মানসম্পন্ন সাংবাদিক ও কলামিস্ট এদেশে অনেকেই আছেন, যারা তাদের ক্ষুরধার ও বুদ্ধিদীপ্ত লেখনী দ্বারা সমাজের অনেক অসঙ্গতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলে আমাদের সমাজ সচেতন করে তোলেন প্রায়ই।

সেই গুটিকয়েক নমস্য সাংবাদিকের সাথে মিশে গেছে সাংবাদিক নামধারী (লেবাসধারী) কিছু নর্দমার কীট; আসলে এরাই বর্তমানে সংখ্যায় বেশি। এসব অপসাংবাদিকতা ইদানীং সাংঘাতিক রকম বেড়ে গেছে। অপ-সাংবাদিক সৃষ্টি এক ধরনের সাংবাদিকতা নির্যাতন। আমরা চাই, সাংবাদিকতা পেশা যেন আগের সৎ ও নির্ভীক চেহারায় ফিরে আসে। সমাজের অনেক সাংবাদিক ত্যাগী, নির্লোভী ও সৎ।

তারা মানবকল্যাণে, সমাজকল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন । এই দিকটিও সরকারকে আমলে নিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যা বন্ধ করা না গেলে সৎ, মেধাবী, যোগ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা এখন যে সংবাদপত্রে ঢুকছেন, তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এমনিতেই সাংবাদিকদের পেশাগত নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নেই, তার ওপর যদি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে বেশভূষা, ভঙ্গিবাজ নামধারী কথিত সাংবাদিকদের কারনে প্রকৃত, পেশাদার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জীবনঝুঁকি বেড়ে যায় কিংবা তারা হামলা-হত্যার শিকার হন তাহলে কিভাবে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে?