ভারতে বিজেপির উত্থান কি হিন্দুদের জন্য হত্যার লাইসেন্স?

প্রকাশিত

দিল্লি: ভারতের ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্য গত অক্টোবরে তাজমহলকে ভারতীয় সংস্কৃতির কলঙ্ক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, মুসলিম ষড়যন্ত্রকারীরা এটা নির্মাণ করেছে। নভেম্বরে, দলের আরেক সদস্য দুজন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের মাথার বিনিময়ে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ওই চলচ্চিত্রে একজন মুসলিম সুলতানকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এরপর, চলতি মাসে এক শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। হত্যাকারীরা এ সময় মুসলিম-বিরোধী শ্লোগান দেয়।

ধারাবাহিক এইসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি ক্ষমতা গ্রহণের পর তিন বছরের মধ্যে মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাব অনেক বেড়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হিন্দু চরমপন্থীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে – হত্যা করে তারা পার পেয়ে যাবে। বাকি অনেকের উদ্বেগ হলো- হিন্দু নেতারা দেশের সমৃদ্ধ মুসলিম ইতিহাসকে মুছে দিতে চাচ্ছে।

ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে উত্তেজনা সবসময়ই ছিল, কিন্তু মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এই উত্তেজনা অনেক বেড়ে গেছে। মোদীর নিজ রাজ্য গুজরাটে চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও ক্ষমতা ধরে রেখেছে বিজেপি। যদিও তাদের ভোটের হার বেশ কমে গেছে।

চলতি মাসে মুসলিম সংসদ সদস্য আসাদুদ্দীন ওয়াসী এক টুইট বার্তায় প্রশ্ন তুলেছেন, মোদী কি সব ধর্মের নেতা নাকি শুধু হিন্দুদের? তিনি লিখেছেন, ‘আপনার মনে রাখা উচিত, সংবিধানের ভিত্তিতে শপথ নিয়েছেন আপনি।’

ইতিহাসবিদ ও লেখক মুকুল কেসাভান বলেছেন, ভারতের মুসলমিরা কয়েক দশক ধরেই বেশ কিছু বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। যেমন বাড়ি কেনা বা ঘর ভাড়া নেয়াটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে।

কেসাভান বলছেন, কিন্তু মোদী এবং তার দল যেন হিন্দুদের অনেকটা মুসলিমদের ওপর হামলার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যে সব মুসলিম গরু কেনা-বেচা করে ও কোরবানি দেয়, তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জায়গাতেই গরু কোরবানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেহেতু হিন্দুরা গরুকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করে।

কেসাভান বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের কোনো শাস্তি হয়নি। অন্যদিকে, হামলার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারকে অবৈধভাবে গরুর মাংস রাখার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিচার এখানে সবসময়ই দুই ধরণের। কিন্তু মানুষ যে এখন হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছে, এই ধারণাটা নতুন। পার পেয়ে যাওয়ার এই ধারণাটা এখন শক্তভাবে গেঁড়ে বসেছে।’

পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাজস্থানে শ্রমিক হত্যার নৃশংসতা অনেককেই নাড়া দিয়েছে। নতুন কিছু অনুষ্ঠানে যে ভিডিও দেখানো হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, নিহত ব্যক্তি পড়ে আছে, পাশেই ঘাতক জোর গলায় শ্লোগান দিচ্ছে। পুলিশ এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করেছে।

কিন্তু অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা ঘটনা টেনে লম্বা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধানই হয়নি। কেসাভান বললেন, পুলিশ প্রায়ই পদক্ষেপ নেয়ার আগে ক্ষমতাসীন দলের পরামর্শের অপেক্ষায় থাকে।

মোদীর বিজেপি অবশ্য সহিংসতাকে উসকে দেয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভারতের কন্সটিটিউশান ক্লাবের অফিসে, দলের মুখপাত্র ও সাবেক সংসদ সদস্য বিজয় শঙ্কর শাস্ত্রী বলেন, হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মাঝে মধ্যে যে সব সংঘাত হয়, সেটা স্বাভাবিক এবং তার দল ক্ষমতায় অনেক আগে থেকেই এটা চলে আসছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের একমাত্র রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো দেশের উন্নয়ন। কোনো জাত, বর্ণ, ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে কোনো রাজনীতি করার ইচ্ছা কখনই আমাদের ছিল না।’

তিনি আরো বলেন, গুজরাটে দুই দশকের শাসনামলে, বিজেপি সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে।

তবু, পদ্মাবতী চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী ও পরিচালকের মাথার বিনিময়ে ১০০ মিলিয়ন রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছে বিজেপির সদস্য সুরাজ পাল আমু। ছবিটি এখনো মুক্তিই পায়নি। গুজব রয়েছে, এই ছবিতে হিন্দু রানীর সঙ্গে এক মুসলিম শাসকের প্রণয় দেখানো হয়েছে।

পরে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ হরিয়ানায় দলের নেতৃত্বের পদ থেকে পদত্যাগ করেন আমু। ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শাস্ত্রী দাবি করেন, আমুর হুমকি সম্পর্কে তিনি বিশেষ কিছু জানেন না। তিনি মনে করেন, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তবে শাস্ত্রী এও বলেন যে, ছবিতে প্রণয় দৃশ্যের গুজব তিনিও শুনেছেন। এটা সত্যি হলে সেটা হবে খুবই দুঃখজনক কারণ সেটা পদ্মাবতীর ঘটনার একটা বিকৃতি।

ছবিটি তৈরী করা হয়েছে ষোড়শ শতাব্দীর একটি কবিতার উপর ভিত্তি করে। যেখানে সুলতানের হাতে ধরা পড়ার থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করেন পদ্মাবতী। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা এই আখ্যান অনেকের কাছে যেন ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

ছবিতে দুই প্রধান চরিত্রের মধ্যে একটা স্বপ্নদৃশ্য রয়েছে, এ রকম একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর এই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে। তবে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালী এ গুজব অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য তাজমহলের বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রচারণা শুরু হয়েছে। ৩৭০ বছর আগে এক মুসলিম সম্রাট তার মৃত স্ত্রীর স্মরণে এই স্থাপত্যটি নির্মাণ করেন।

তাজমহল যেখানে অবস্থিত, সেই উত্তর প্রদেশের নির্বাচিত এক শীর্ষ হিন্দু কর্মকর্তা গত সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, এখানে সফরকারী বিদেশী প্রতিনিধিদের হিন্দু ধর্মগ্রন্থের কপি দেয়া উচিত, তাজমহলের রেপ্লিকা নয়।

প্রাদেশিক সরকার পরে সরকারী পর্যটন গাইড থেকে তাজমহলের নাম বাদ দেয়, যদিও পরে তাকে আবার সেটি ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। সবশেষ গত অক্টোবরে, বিজেপি সংসদ সদস্য সঙ্গীত সোম তাহমহলকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতির কলঙ্ক’ হিসেবে মন্তব্য করেন।

অনেকে আবার দাবি করতে শুরু করেছেন যে, তাজমহল নির্মাণের আগে সেখানে একটি হিন্দু মন্দির ছিল।

ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগে কর্মরত পুরাতত্ত্ববিদ ভূবন বিক্রম বলেন, তাজমহলের স্থলে হিন্দু মন্দির থাকার যে তত্ত্ব, তার স্বপক্ষে সামান্যতম প্রমাণও নেই।

কলকাতা থেকে তাজমহল দেখতে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট পৃথা ঘোষ। তিনি বললেন, রাজনীতিবিদরা ধর্মীয় মতপার্থক্যের উপর খুব বেশি জোর দিচ্ছেন যেটা তার দৃষ্টিতে একটা বিপজ্জনক পথ।

তিনি বলেন, এই স্থাপত্য থেকে রাজনীতিকে দূরে রাখা উচিত। এটা ভারতের অহঙ্কার। অবশ্যই সবাই এটাকে ভালবাসে। এবং এরকম কোনো বিষয় যখন আসবে, তখন কোনো হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গই সেখানে তোলা উচিত না।

 

Be the first to write a comment.

Leave a Reply