মিয়ানমারে গণহত্যা

প্রকাশিত

হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জঘন্য তৎপরতা অনেক দিন ধরেই চলছে। তারই বর্বরতম প্রকাশ ঘটেছে গত আগস্ট মাসে।

সেনাবাহিনী ও বর্ডার পুলিশ মিলে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। নির্বিচারে হত্যা করেছে রোহিঙ্গাদের। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সীমান্তহীন চিকিৎসকদল (এমএসএফ) নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে ২৫ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসেই কমপক্ষে ছয় হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত একটি গ্রামে একটি গণকবরও আবিষ্কৃত হয়েছে। আর রোহিঙ্গাদের ওপর এই ঘৃণ্যতম হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডার মেজর জেনারেল মং মং সো। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তাদের হাতে মং মং সোর সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কোনো সম্পদ থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করারও ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করছে না। রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে পারছে না, যা গোটা বিশ্বকে মর্মাহত করছে।

কয়েক দশক আগে থেকে মিয়ানমারে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এমন হামলা চলে আসছে। সেখানে তাদের জীবনধারণের প্রায় সব সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকেই বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, জীবন বাঁচাতে আরো অনেক দেশেই রোহিঙ্গারা এভাবে পাড়ি জমিয়েছে। বিপজ্জনকভাবে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত রোহিঙ্গাকে জীবনও দিতে হয়েছে। বাংলাদেশে গত কয়েক মাসে আসা সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গাসহ ১১ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির একটি দেশ তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের কোনো শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছে না। সম্প্রতি দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত একটি চুক্তি করলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে, সে সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান। দেশটির কাজকর্মে মনে হয়, তারা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা বিশ্বকে থোড়াই পরোয়া করে। সম্প্রতি জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াং লির আসন্ন মিয়ানমার সফরে বাধা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়েছে তাঁকে বিশেষ দূতের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত হামলা-নির্যাতনকে জাতিসংঘ জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনেক বিশ্বনেতা একে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার কাজেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ পৃথিবীর কোনো প্রান্তেও যদি এমন বর্বরতা করে কোনো শাসকগোষ্ঠী পার পেয়ে যায়, তাহলে সেটি সারা পৃথিবীর সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু আরো বিপদের মুখেই ঠেলে দেবে। আমরা চাই, জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্ব এ ব্যাপারে আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নিক।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply