মোবাইলের অননেট কল নিয়ে অন্ধকারে বিটিআরসি

প্রকাশিত

দেশে মোবাইল ফোন সেবা চালু হয় ২৯ বছর আগে ১৯৯৮ সালে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) চালু হয়েছে এর ১৩ বছর পর ২০০২ সালের জানুয়ারিতে। তবে কোন মোবাইল অপারেটর তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে (অননেট) কী পরিমাণ কল আদান-প্রদান করছে তা জানার নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। বিটিআরসিকে অপারেটরদের প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে তথ্যের জন্য এবং এ তথ্য বিনা প্রমাণে মেনে নিয়ে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। একই অবস্থা ইন্টারনেট ডাটা এবং বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত সেবার ক্ষেত্রেও। কিন্তু মোবাইল অপারেটরদের ওই প্রতিবেদনে যে সঠিক তথ্য দেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।

বিটিআরসির সাম্প্রতিক এক সভায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে সভার কার্যপত্রে বলা হয়, ‘অপারেটরদের অফনেট (এক নেটওয়ার্ক থেকে অন্য নেটওয়ার্কে) কলের বিষয়টি আইসিএক্স (ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ) থেকে যাচাই করা গেলেও অননেট কলের প্রকৃত পরিমাণ অপারেটরদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় এবং তার ভিত্তিতেই রাজস্ব আদায় করা হয়। এর সঙ্গে যদি ইন্টারনেট ডাটা এবং মূল্য সংযোজিত সেবাসমূহের ব্যবহার থেকে রাজস্ব আদায়ে বিটিআরসির সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়, তাহলে বলা যায় যে মোবাইল অপারেটরদের কাছে রাজস্ব আহরণের বিষয়টি মূলত তাদের প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ বর্তমান ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সীমিত।’

কার্যপত্রে বলা হয়, ‘টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা নজরদারি এবং রাজস্ব অর্জনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিআরসি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানসমূহের আর্থিক এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার অডিট করে থাকে। কিন্তু বর্তমান অডিট সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করা হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণরূপে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের রক্ষিত সিডিআরের ওপর নির্ভরশীল, যা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ থাকে। কারিগরি সীমাবদ্ধতা থাকায় অপারেটররা দীর্ঘদিন সিডিআর সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে সিডিআরভিত্তিক ম্যানুয়াল অডিটব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে একটি দুর্বল ভিত্তির ওপর অবস্থান করছে।

কার্যপত্রে বলা হয়, বিভিন্ন সময় অডিট করার ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা প্রমাণিত হয়েছে। এ বাস্তবতায় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এ অডিট সম্পন্ন করায় তথ্য আহরণ এবং তথ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো আরো জটিল হয়ে দাঁড়ায়। এ জটিলতা অপারেটরদের সঙ্গে বিটিআরসির একটি বিশ্বাসযোগ্য সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তরায়।

জানা যায়, এ সমস্যা সমাধানে বিটিআরসি কয়েক বছর আগে থেকেই নানা উপায় অনুসন্ধান করে আসছে। গত বছরের ২৪ এপ্রিল বিটিআরসির ২০৪তম সভায় এ বিষয়ে টেলিকম অপারেশনস মনিটরিং সেন্টার বা টিওএমসি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সেন্টার আজও গড়ে ওঠেনি।

সব শেষ গত ৮ ও ৯ এপ্রিল বিটিআরসির ২১২তম সভায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এ সভার কার্যপত্রে টিওএমসি স্থাপনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়, ‘বিটিআরসিতে এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা তথ্য সংগ্রহ এবং রিপোর্টিং প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে; সেই সঙ্গে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য রিয়েল টাইম (বাস্তব সময়ে) পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে ভয়েস, ডাটা ট্রাফিক, নেটওয়ার্ক ব্যবহার এবং মান সম্পর্কিত তথ্য—সর্বোপরি বিটিআরসির প্রাপ্য রাজস্ব সম্পর্কে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া টিওএমসি প্রতিষ্ঠার ফলে বিটিআরসির নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হবে এবং সরকারের কাছে প্রতিবেদন পেশ ব্যবস্থা দক্ষ ও দ্রুত হবে।

বর্তমান ব্যবস্থায় মোবাইল অপারেটররা অননেট ভয়েস কল, ডাটা ট্রাফিক—এসবের সঠিক পরিমাণ জানাচ্ছে না বলে সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও ওই কার্যপত্রে বলা হয়, ‘টিওএমসি স্থাপনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার ফলে প্রতিবছর রাজস্ব আয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে।

সভায় টিওএমসি স্থাপনের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ‘টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা’ শীর্ষক খাত থেকে আট কোটি টাকা বরাদ্দ ও আগামী বছর সংশোধিত বাজেট সমন্বয়ের সময় অবশিষ্ট অর্থ সমন্বয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে টিওএমসির জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করারও অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এসব বিষয় বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস (ইঅ্যান্ডও) বিভাগকে। কিন্তু ওই অনুমোদন পাওয়ার পর গত ছয় মাসে ক্রয়প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।

এ বিষয়ে বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহিরুল হক শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে আমাদের অনেক কাজ যথা সময়ে সম্পন্ন হচ্ছে না।’ বিটিআরসির মহাপরিচালক (ইঅ্যান্ডও) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফা কামাল বলেন, ‘আমরা কিছুদিনের মধ্যেই এ কাজের টেন্ডারপ্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছি।’

বিটিআরসি সূত্র জানায়, টিওএমসি স্থাপনের জন্য মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রান্তেও কমপ্লেইনস মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করতে হবে। এ বিষয়ে অপারেটরদের লাইসেন্সের গাইড লাইনেও প্রয়োজনীয় ধারা সংযোজন করা আছে। তাদেরকেও এ কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রবি আজিয়াটা লিমিটেডের হেড অব করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স শাহেদ আলম জনান, তাঁরা গত আগস্টেই এ নির্দেশনা পেয়েছেন এবং মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মাধ্যমে বিটিআরসিকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে লাইসেন্সের গাইড লাইন অনুসারে তাঁরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন।