মো. সাহেদ কি এ যুগের ভিক্টর লাস্টিগ?

প্রকাশিত

খুব বেশি পাঠক ভিক্টর লাস্টিগের নাম না-ও শুনে থাকতে পারেন। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে বিশ্বের সেরা বাটপাড় আর টাউট যিনি ইউরোপ আর আমেরিকা জুড়ে তার বাটপাড়ির কারণে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। লাস্টিগ জন্মেছিলেন হাঙ্গেরিতে। লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন। দক্ষতা ছিল একাধিক ভাষায়। তার বাটপাড়ি পেশা শুরু করেন ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজে। জুয়ায় বেশ পারদর্শী ছিলেন লাস্টিগ। অন্য যাত্রীদের সঙ্গে জাহাজে চড়ে বসতেন। জাহাজের জুয়া খেলার আসরে খুব সহজে জুয়াড়িদের ঠকাতেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণের পর তাদের ভালো ব্যাবসায়িক সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে সুযোগ বুঝে কেটে পড়তেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে লাস্টিগ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে একজন বাটপাড় হিসেবে পুলিশের খাতায় তার নাম উঠে যায়। তার বাটপাড়ি নিয়ে অনেক বই রচিত হয়েছে। সিনেমা বানানো হয়েছে একাধিক। লাস্টিগের বাটপাড়ির সব কথা এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়। শুধু সে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার কীভাবে বিক্রয় করে দেয় তার উল্লেখ করে বাংলাদেশে ফিরে আসব।

১৯২৫ সালে লাস্টিগ ফ্রান্সে চলে যায়। সেখানে সে একদিন দেখে পত্রিকায় আইফেল টাওয়ারের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থার উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন। সরকারেরও বড় ধরনের তহবিল ঘাটতি। প্রকাশিত সংবাদে জনগণের বেশ কিছু মন্তব্য প্রকাশিত হয়, যেখানে তারা অভিমত প্রকাশ করেন যে, এই টাওয়ারটি প্যারিস নগর থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত। লাস্টিগ দ্রুত একটা পরিকল্পনা এঁটে ফেলে। সে আরেক জালিয়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার নামে কিছু সরকারি প্যাড ছাপিয়ে ফেলে। নিজে বনে যান সরকারের একজন মন্ত্রী। প্যারিসের একটি দামি হোটেলে একটি কক্ষ ভাড়া করে সে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত পুরোনো লোহালক্কড় ব্যবসায়ীকে সেখানে একটি গোপন সভার বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। বৈঠক হয়। লাস্টিগ পিয়ারসন নামক একজনকে বাছাই করে এবং পরে আর একটি বৈঠকে তাকে বলে এত বড় একটা ব্যাবসায়িক ডিল দিতে হলে তাকে কিছু অর্থ বাড়তি দিতে হবে। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের এ-ও বলা হয়েছিল, যেহেতু আইফেল টাওয়ারের সঙ্গে প্যারিসের জনগণের একধরনের আত্মিক সম্পর্ক জড়িত আছে, তাই বিষয়টি আপাতত গোপন রাখতে হবে। লাস্টিগ পিয়ারসনের কাছ হতে সব শুদ্ধ সত্তর হাজার ফ্রাঁ নিয়ে অস্ট্রিয়া পালিয়ে যায়। পিয়ারসন পরে যখন জানতে পারেন তিনি এক বড় ধরনের ধাপ্পাবাজির শিকার তখন তার কিছু করার ছিল না। বিষয়টা তিনি পুলিশকেও জানাননি। কারণ, সবাই তার এই ধরনের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসাহাসি করবে। লাস্টিগ এই কাজ আরো একবার করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ আগাম জানতে পারায় পালিয়ে লাস্টিগ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গত কয়েক মাস ধরে সংবাদের মূল বিষয় হচ্ছে কিছু চোর-বাটপাড়-বদমাইশের কথা। ভালো খবর তেমন একটা গুরুত্ব পায় না। শুরু হয়েছিল জি কে শামীম দিয়ে এবং সবশেষে যোগ হয়েছে একজন উচ্চপদস্থ সাবেক সেনা কর্মকর্তা দিয়ে, যিনি কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এসএসএফের মহাপরিচালক ছিলেন। মাঝখানে মিঠু, পাপিয়া, পাপুল, মো. সাহেদ, আরিফ, ডা. সাবরিনা আর সাহাবুদ্দিন হাসপাতাল। তবে এদের মধ্যে মো. সাহেদ বাংলাদেশের চোর-বাটপাড়ের তালিকায় নিজেন নাম চিরস্থায়ী করে নিয়েছে। সাহেদের বাটপাড়ির গোড়ার ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সঙ্গে বিএনপির বেশ কয়েক জন শীর্ষ পর্যায়ের নেতার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করি, তখন তিনি বিএনপির একজন বড় বরকান্দাজ। তবে সে জনসম্মুখে বিএনপির পতাকা নিয়ে আসার তেমন একটা সুযোগ পায়নি। ওপরে হাওয়া ভবন আছে না!

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক জাদুমন্ত্র বলে সেই মো. সাহেদ বনে গেলেন একজন বড় মাপের সরকারি ও আওয়ামী লীগের ভিআইপি। কখনো আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য, কখনো প্রধানমন্ত্রীর এডিসি বা এপিএস। বলে বেড়াতেন অফিস করেন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে। উপস্থিত থাকতেন সব সরকারি অনুষ্ঠানে। একটি ছবিতে দেখা গেল কোনো এক মাঠের অনুষ্ঠানে, হতে পারে সশস্ত্র বাহিনীর অথবা পুলিশ সপ্তাহের কুচকাওয়াজে এই সাহেদ বসে আছে সামনের সারির সোফায় পা লম্বা করে। তার পাশে প্রধানমন্ত্রীর এক কালের পিএস-১ আর একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। ঢাকার বাইরে একবার সে গিয়েছিল রাঙ্গামাটির সাজেকে। অবাক কাণ্ড হচ্ছে, তার সামনে-পেছনে পুলিশ এসকর্ট। এখানে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বলতে হয়। বছরখানেক আগে আমি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান। আমার যিনি পূর্বসূরি তাকে সার্বক্ষণিক গানম্যান দেওয়া হয়। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার একান্ত সহকারী পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে চিঠি লিখেন কিন্তু কাজ হয় না কিছু। ঢাকার বাইরে গেলে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর রেওয়াজ আছে। অনুরোধ করা হয় প্রটোকলের ব্যবস্থা করতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পালটা প্রশ্ন ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স-এ স্যারের অবস্থান কী?’ ১৯৯৭ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। একটি ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে বোমা মারল। পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ফোন করে আমার ও পরিবারের কুশল জানতে চাইলেন। ওদিন হতে আমার বাড়িতে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হলো। পূর্ববর্তী পদে থাকার সময় দুজন বড় মাপের ব্যক্তি আমাকে নিজে এসে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিল। এটা আমার জন্য নতুন নয়। আমি এই বিষয়ে শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে অবহিত করলে কমিটি বিষয়টি লিপিবদ্ধ করে। কিন্তু ব্যবস্থা হয় না কিছুই। প্রটোকল বা গানম্যানের কথা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে কিছু কিছু জায়গায় সব সময় প্রটোকল পেয়েছি। আর সাহেদ কতই-না ভাগ্যবান। চাইলেই প্রটোকল পাওয়া যায়। পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ।

প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিতে গণভবনে প্রবেশ সাহেদের কাছে নস্যি। অবাক কাণ্ড হচ্ছে কোনো এক স্কুলে সাহেদ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ছাত্রদের সালাম নিচ্ছেন। পেছনে পেছনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সাহেদের রিজেন্ট কাণ্ড নিয়ে তো দেশে তুলকালাম হচ্ছে। বিদেশের গণমাধ্যমেও রিজেন্ট খবরের প্রধান শিরোনাম। সঙ্গে আছে জিকেজি, ডা. সাবরিনা আর তার স্বামী আরিফ। তার রেশ শেষ না হতেই সামনে এলো সাহাবুদ্দিন হাসপাতালের কাণ্ড। এরা সবাই মিলে বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক আদালতে আসামির কাঠগড়ায় তুলে দিয়েছে। অথচ এই দেশটির জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আর এই দুর্বৃত্তরা তার এসব পরিশ্রম নস্যাত্ করার জন্য স্বজ্ঞানে লাগাতার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কেমন করে সাহেদ-সাবরিনারা সৃষ্টি হয়! এদের সৃষ্টির পেছনে নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতিই দায়ী। এই সংস্কৃতি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদ ও বর্তমান মেয়াদের আগের দুই মেয়াদে এই সংস্কৃতিটা আওয়ামী লীগের জন্য তেমন একটা প্রযোজ্য ছিল না। বর্তমান মেয়াদে দলের ভেতর থাকা বেশ কিছু মানুষ বেপরোয়া হয়ে গেছে বলে অনেকের ধারণা। কারা এরা? এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এর ইতিহাস সম্পর্কেও তারা অনেকটা অজ্ঞ। কেউ ঢুকেছে পৈতৃক সূত্রে, কেউ বা অর্থের বিনিময়ে। এটা শুধু মূল দলে হয়েছে তা নয়, অঙ্গ সংগঠনগুলোতে আরো বেশি হয়েছে। বর্তমান সময়ে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা—এখন পদ, পদবি আর পদক টাকা দিলেই পাওয়া যায়। শুধু জানতে হবে গ্রহীতা কে। লিখেছিলাম আগে। এ বছর একুশে পদক ঘোষণা করার পর একজন আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন ‘স্যার এই পদক পেতে হলে কত টাকা লাগে বা কার কাছে যেতে হবে?’ তাকে বলি আমার অজ্ঞতার কথা।

যাদের নাম করেছি তারা সব ধরা পড়েছে, বাংলাদেশের লাস্টিগসহ। তবে ধরা না পড়া বাটপাড়ের সংখ্যা হয়তো আরো কয়েক গুণ হতে পারে। বাটপাড় সব সময় ছিল। তবে পার্থক্য হচ্ছে বর্তমান সরকারের সময় তাদের ধরা হচ্ছে, বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। এখানে হলফ করে বলতে পারি প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তার কারণেই তা হচ্ছে। তবে আটক বা বিচারের মুখোমুখি করার চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এসব চোর, বাটপাড়, ধান্ধাবাজ, ফেরেববাজ, চশমখোর কীভাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগে ঢুকল তা খুঁজে বের করা। আওয়ামী লীগে আর একজন তাজউদ্দীন বা সৈয়দ নজরুল ইসলাম হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু আর একজন শেখ হাসিনা বা মতিয়া চৌধুরী অথবা সদ্য প্রয়াত ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ তো পাওয়া যাওয়া উচিত। চেষ্টা করা হোক এই দলটিকে সাহেদের মতো বাটপাড়মুক্ত করার। এই কাজটি একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যাই পারবেন বলে দেশের আপামর জনগণের ধারণা। অন্যদের অনেকের ওপর আস্থা এখন তলানিতে।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক