যেমন থাকে নির্বাচনি বছরগুলোর অর্থনীতি

প্রকাশিত

রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতির মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে এর আগে ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোর সময় পর্যালোচনায় দেখা গেছে,  ওই ওই বছরগুলোয় এই চিত্র স্থিতিশীল ছিল না। এ সময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কর্মসূচি, পাল্টা কর্মসূচি, মারামারি, শো-ডাউন, হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক গতি হারায়। আমদানি-রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যাংকগুলোয় চলে অস্বাভাবিক লেনদেন। এ কারণে নির্বাচনের সময় সংঘটিত হানাহানি থেকে নিজের সম্পদ মুক্ত রাখতে অনেকেই জমানো অর্থ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়। ফলে রাজস্ব আহরণ থেকে শুরু করে, রিজার্ভ, রেমিটেন্স, রফতানিও কমে যায়। ব্যাংকগুলোয় বাড়তে অলস টাকার পরিমাণ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অনুবিভাগের ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় এই চিত্র পাওয়া গেছে।

‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হলেও  নির্বাচন শেষে প্রবৃদ্ধি আবারও সামনের দিকে এগোতে থাকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেমন হবে ২০১৮ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সে বিষয়টি নিয়ে এখনই চলছে জল্পনা-কল্পনা। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ২০১৮ সালে দেশের অর্থনীতি গত কয়েকবছরের গতিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হতে পারে। যেমন ব্যর্থতার চিত্র দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়।  একই পরিস্থিতি ছিল ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এর আগের ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম এবং ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছরও প্রায় একই পরিস্থিতি ছিল।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৮-তে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের বছর (২০০৭-০৮ অর্থবছর) দেশের বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩৯ কোটি ২১০ লাখ টাকা)। অথচ তার আগের ২০০৬-০৭ অর্থবছর দেশের বাণিজ্যঘাটির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২৩ কোটি ৭৪০ লাখ টাকা)। রাজনৈতিক হানাহানির কারণে দেশের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে।

একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে ২০০৮-০৯ অর্থবছর রেমিটেন্স এসেছে ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৯৭০ কোটি টাকা)। ঠিক এর পরের অর্থবছর (২০০৯-১০)  রেমিটেন্স এসেছে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ হাজার ১০০ কোটি টাকা)। ২০১৪ সালের নির্বাচনের বছর জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আর নির্বাচনের পরের বছর ২০১৫ সালের জুন মাসের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছিল ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।

২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর পরের বছর ২০০৯ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৫৭ শতংশ। একইভাবে সর্বশেষ অর্থবছর ২০১৪ সালে নির্বাচনের বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছর এ হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ।

২০১৪ সালে নির্বাচনি বছরের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৩৪ বিলিয়ম মার্কিন ডলার। আর এর পরের বছর ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৮ বিলিয়ন মর্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে নির্বাচনের বছর স্থানীয় (শতভাগ দেশি), বিদেশি ও যৌথ—এই তিন শ্রেণিতে মোট ১ হাজার ৪৩২টি প্রকল্প নিবন্ধিত হয়েছিল। নিবন্ধিত এসব প্রকল্পের মোট মূলধনের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ১৩৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর এসব প্রকল্পের অধীনে মোট কর্মসংস্থান ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার জনের। আর ২০১৫ সালে নিবন্ধিত এসব প্রকল্পের অধীনে মোট মূলধনের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৮৭ হাজার ৫২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। সে হিসাবে ২০১৫ সালে নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বেশি। যা শতকরা হিসাবে ২১ দশমিক ৩২ শতাংশ।

২০১৪ সালে নির্বাচনের বছর কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। আর এর পরের বছর ২০১৫ সালে কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

২০১৪ সালে নির্বাচনের বছর প্রথম পাঁচ মাসে ২০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল। আর এর পরের বছর ২০১৫ সালের প্রথম ৫ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৪ শতাংশ।  অন্যদিকে ২০১৪ সালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছিল মোট ঋণের ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর ২০১৫ সালের বছর শেষ হওয়ার ২ মাস আগেই অক্টোবর পর্যন্ত এই হার প্রায় দাঁড়িয়েছিল ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গ জানতে চাইলে ড. সালেহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী বছর নির্বাচনের বছর হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি না হলে আগামী বছরও (২০১৮) দেশের অর্থনৈতিক অবস্থ ভালো যাবে।’

Be the first to write a comment.

Leave a Reply