রাজনীতি থেকে মনস্তাত্ত্বিক বিষফোড়ার অবসান চাই

প্রকাশিত

 

মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা – কোন অন্তঃসার শূন্য মেধাহীন স্বার্থপর নেতা নিয়ে আমাদের এতো টানাটানি, এতো আনন্দ, এতো উল্লাস, কেনো আমাদের মধ্যে এই পরিবর্তন? কেনো মানসিকতার বৈকল্য? কেনো আদর্শিক চেতনার অভাব? ইতিহাস-ঐতিহ্যের দেশ বাংলাদেশ, প্রতিবাদের দেশ বাংলাদেশ, অনুপম সম্প্রদায়-সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় গনতন্ত্রকামী একটি দেশ বাংলাদেশ । রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের দেশ বাংলাদেশ, গাজী-শহীদের রক্তেভেজা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন বহু বছর পূর্বে থেকে । তবে দুর্ভাগ্য বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে নেতা বলেন আর কর্মী বলেন উভয়ের কাজের চেয়ে চাপার জোর অনেক গুন বেশি । অনেক সময় দেখা যায় কর্মী মাঠের রাজনীতি করে জীবন যৌবন ক্ষয় করেও নেতার প্রশংসা কুড়াতে পারেন না, আবার কেউ মাঠের রাজনীতির ধারে কাছে না থেকেও চাপা আর টাকার জোরে সহজেই কিন্তু নেতার বাহবা কুড়াতে পারেন । তেলমর্দনে যেমন মেধাবীরা অসহায়, তেমনি কালো টাকা আর চাপাবাজদের কাছে মাঠ পর্যায়ের যোগ্য কর্মীরা নেতার কাছে অসহায়, আমার দৃষ্টিতে এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের সবচাইতে ভয়াবহ ডিজিটাল রাজনীতি । তাড়াতাড়ি নেতা হবার আশায় আমরা অনেক সময় দলের আদর্শকে লালন করিনা, পালন করিনা দলের যোগ্য নেতার নির্দেশ । আবার অনেক সময় নেতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যার ফলে একটা সময় কর্মী শূন্য মাঠে সবাই হয়ে যায় নেতা । আমরা উপযুক্ত একজন নেতা পেলে যেমন গর্জে উঠতে জানি তেমনি জানি সেই নেতার দুর্বলতার সুযোগ খুঁজতে। নেতৃত্ব সবাই দিতে পারে না, আবার সব নেতার নেতৃত্ব সবকর্মীরাও মেনে নেয় না । নেতা সেই হতে পারে যে তার দলের সাধারণ কর্মীদের দুর্বলতাকে জয় করতে পারে, আর অন্যদেরও শক্তিশালী হওয়ার স্বপ্ন দেখায় । একজন নেতার কাজ নেতৃত্ব নিজের হাতে নেয়ার জন্য নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং এগুলোকে নিজের ভেতর থেকে দূর করা। নিজের প্রতি কঠোর হতে পারা হচ্ছে উন্নতি, সাফল্যও নেতৃত্বের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ । নেতাকে তার লক্ষ্য পূরণের জন্য শুধু এই একটি গুণ অর্জন করাই যথেষ্ঠ । একজন যোগ্য নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারলে, অন্যরাই আগ্রহী হয়ে দলের স্বার্থে আপনার সাফল্যের জন্য কাজ করবে । ১৯৫২, ৬৯, ৭১ অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন আমাদের পূর্ব পুরুষরা সব সময় অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাদের কণ্ঠে যখন বিপ্লবের দানা ধূমায়িত হয়েছিল, তখন তারা ছিলেন পরাধীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে অন্যায়, অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারা মাঠে-প্রান্তে বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, গেয়েছিলেন স্বাধীনতার জয়গান। বীরদর্পে উচ্চারণ করেছিলেন “লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই” এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ করে আমাদেরকে এনে দিয়েছেন একটা স্বাধীন-স্বার্বভৌম বাংলাদেশ । এখন এই স্বাধীন দেশের রাজপথে রাজনৈতিক মোকাবিলায় যখন আমরা সেই একই স্লোগান দেই ” লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই” তখনই প্রশ্ন জাগে, আমরা কার বিরুদ্ধে, কার সাথে লড়াই করবো? আমাদের বীরপুরুষেরা তো তাদের জীবন বাজি রেখে সেই কাজটি আমাদের জন্য করেই গেছেন ! স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর হয়ে গেছে তারপর এখনও নিজেরা নিজেদের মাঝে লড়াই করার অর্থ হচ্ছে আমার দৃষ্টিতে, আমরা আমাদের বীরদের বীরত্বকে অস্বীকার করা, অসম্মান করা, তাদের দেশপ্রেমকে অস্বীকার করা। স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ সময় পার করেছি কিন্তু আদর্শের ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের অবসান করতে পারিনি। তাই আমরা সাধারণ মানুষ আমাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সফলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি । বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে দেশ এবং দেশের গণতন্ত্র বা রাজনৈতিক দলের আদর্শ বড় কথা নয়, ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজের চেয়ার দখলই বড় কথা। স্বার্থের লড়াইয়ে আমরা পরস্পর নিজেদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতায় মাঠে নামতে জানি অথচ ফেলানির লাশ যখন সীমান্তে কাঁটাতারের উপর ঝুলছিল তখন শুধু আমরা পত্রিকার পাতায় চেয়ে চেয়ে দেখেছি কিন্তু শক্ত প্রতিবাদ করতে সাহস করি নাই । নিজেদের ক্ষমতার জন্য আমরা অনেক কিছুই করতে পারি, স্বার্থের মোহে চোরাগলিতে পা বাড়াই। আমরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি, তাদের হাতে কলমের বদলে অস্ত্র তুলে দিতে দ্বিধা করি না । আর সে জন্যই তো আবরারের মতো মেধাবী ছাত্রকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের হাতে। আমরা গনতন্ত্রেরগান গাইতে জানি কিন্তু গণতন্ত্রের কোনো প্র্যাকটিস আমলে নেই না। গনতন্ত্রের মূলমন্ত্র হচ্ছে ভিন্ন মতের অনুসারী যেন তার মত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে আমরা পরস্পরে ভিন্ন মতকে সহ্য করতে পরি না। গণতান্ত্রীক দেশে স্বাধীনভাবে সবার মত প্রকাশের অধিকার আছে সে জন্য প্রতিপক্ষের শব্দের মোকাবিলা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। এক সময় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী থেকে শিক্ষিত যোগ্য নেতা তৈরি হতো এবং তারাই হতো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কর্ণধার । এখন এ সবের কোনো বালাই নেই । দলের নেতা তৈরির কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কালো টাকার জোরে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতা তৈরি হচ্ছে যার জন্য কর্মীশূন্য হয়ে ধীরে ধীরে মাঠের রাজনীতি বিলুপ্তির পথে। একটা রাজনৈতিক দলের কর্মী যখন কোনো অপকর্ম করে তখন তাকে কেবল দোষ দিয়েই কি লাভ! নেতা যখন কালো টাকার কাছে তার নিজের আদর্শ বিক্রি করে। সত্য কথা বলতে কিছু নেতারাই অনেক সময় স্বার্থের জন্য নিজ রাজনৈতিক দলের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করছেন। মাঝে মধ্যে দেখবেন এমন নেতাও পাওয়া যায় যে তার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী দলের মনগড়া সংজ্ঞা দিয়ে দিচ্ছেন। আদর্শিক চেতনার অভাবেই সুবিধাবাদী নেতাদের কারণে পোড়খাওয়া শিক্ষিত, যোগ্য, সৎ নেতারা রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়ছেন। বর্তমান সময়ে কালো টাকা আর আত্মীয়করণের খপ্পরে রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়েছে। “বানরের রুটি ভাগ” গল্পটি শৈশবের হলেও বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে এখন তার তাৎপর্য বাস্তবরূপে অনুভব করা যায় । আমরা আমাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সফলতা থেকে বিতাড়িত হচ্ছি শুধুমাত্র এই সমস্ত ব্যক্তি সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের কারণে । রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে সেদিন, যেদিন রাজনীতি থেকে মনস্তাত্ত্বিক বিষফোড়ার অবসান হবে এবং গণতন্ত্রকামী সকল রাজনৈতিক দলের মাঝে ফিরবে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা ।