রাজশাহীতে মেয়র প্রার্থীর প্রচারে ‘নেই’ কাউন্সিলররা

প্রকাশিত

ভোটারদের কাছে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর মতামত, প্রভাব ও প্রচারণা মেয়র প্রার্থীর জয়-পরাজয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাউন্সিলর প্রার্থী যদি দলীয় আদর্শের হন তবে তিনি নিজের ভোট চাওয়ার পাশাপাশি দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষেও প্রচারণা চালাবেন সেটাই স্বাভাাবিক। তবে রাজশাহীতে দেখা যাচ্ছে, অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী নিজেদের জন্যই শুধু ভোট চাচ্ছেন, এড়িয়ে যাচ্ছেন মেয়রের জন্য কথা বলা। আবার বিএনপির রাজনীতি করা কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটের তদবির করছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে এমনও দেখা যাচ্ছে।

বিগত ২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০টি ওয়ার্ডে বিএনপি-জামায়াতপন্থী ২৩ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংরক্ষিত ১০ নারী কাউন্সিলরের মধ্যে সাতজনই ছিলেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী। সেবার আগে থেকেই বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অবস্থান ভালো দেখে অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী নিজেদের পাশাপাশি বিএনপির মেয়র প্রার্থীর হয়েও প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু এবার উল্টোটা দেখা যাচ্ছে। বিএনপিপন্থী অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রচারণা না চালালেও বলে বেড়াচ্ছেন তাঁদের প্রতি লিটনের আস্থা আছে। ফলে কাউন্সিলরকেন্দ্রিক প্রচারণার ভিত্তিতেও মেয়র প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ কষছে সাধারণ ভোটাররা।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, কাউন্সিলরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারণা মেয়র নির্বাচনেও বড় ভূমিকা রাখে—এই চিন্তা মাথায় রেখে এবার তারা নগরীর ১৩টি ওয়ার্ডে একক কাউন্সিলর প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে। এর বাইরে ১৭টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগপন্থী একাধিক প্রার্থী থাকায় সেসব ওয়ার্ডে কাউকেই সমর্থন দেওয়া হয়নি। তবে যেসব ওয়ার্ডে বিএনপি কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রভাব বেশি, সেসব ওয়ার্ডে তাদেরকেই আওয়ামী লীগের পক্ষে টানা হচ্ছে। অন্তত ১০টি ওয়ার্ডে বিএনপিপন্থী প্রভাবশালী কাউন্সিলর প্রার্থীদের এবার ম্যানেজ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এবার অন্তত ২৩টি ওয়ার্ডে পছন্দমতো কাউন্সিলর প্রার্থীদের দিয়ে মেয়র প্রার্থী লিটনের পক্ষে প্রচারণার কাজও চালানো হচ্ছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী সিটি নির্বাচনকে ঘিরে এবার নগরীর ১৫ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপিপন্থী বর্তমান কাউন্সিলর এবং পুনরায় প্রার্থী আব্দুস সোবহান লিটন এবং মনির হোসেন দুজনই এবার প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী লিটনের পথসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন। তাঁরা নিজেদের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি লিটনের পক্ষেও ভোট চাইছেন। এর বাইরে গতবার নির্বাচিত হওয়া অন্তত আটজন বিএনপিপন্থী কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান হাবিব, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে তরিকুল আলম পল্টু প্রমুখ। জানতে চাইলে মনির হোসেন বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে রাজশাহীর উন্নয়ন হয়নি। সরকার ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। এ কারণে বিএনপির মেয়র হয়েও বুলবুল কাজ করতে পারেননি। তাই রাজশাহী ও আমার ওয়ার্ডের উন্নয়নের কথা বিবেচনা করেই আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে এবার ভোট চাইছি।’ ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরু বলেন, ‘কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে মূলত নিজের ভোট নিয়েই ব্যস্ত আছি। তার পরও দলের মেয়র প্রার্থী হিসেবে লিটনের জন্যও কাজ করছে আমার নেতাকর্মীরা।’

১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর রবিউল ইসলাম মিলু বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত জেনে আওয়ামী লীগের লোকজন নানাভাবে আমাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে। এমনকি মাইকও ভাঙচুর করছে। প্রচারণা চালাতে গেলেও নানাভাবে বাধা দিচ্ছে।’ তবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল মোমিন বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরাই তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে আমার পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন খুলে ফেলছে। বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী জনরোষ থেকে বাঁচতে নিজেও মাঠে যাচ্ছেন না।’

সূত্র মতে, মেয়র প্রার্থীর ভোট নষ্ট হতে পারে এ আশঙ্কায় নগরীর ১৯, ৭ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ আরো কয়েকটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণার সময় দলীয় পরিচয় দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিতর্কিত যুবলীগ নেতা তৌহিদুল হক সুমন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রুবেল হোসেন, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিতর্কিত শ্রমিক নেতা মাহাতাব আলী।

অন্যদিকে মেয়র প্রার্থী বুলবুলের নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে এমন আতঙ্কেও বিএনপির অনেকেই তাঁর পক্ষে প্রচারণা না করে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিএনপিপন্থী কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে এখনো যারা আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়েননি, তাঁরাও এবার অনেকটা চুপচাপ আছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তাঁরা নিজেদের ভোট নিয়েই ব্যস্ত। এদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. টুটুল, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের রুহুল আমিন টুনু, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সোহরাব হোসেন, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের আবু বাক্কার কিনু, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ইকবাল হোসেন দিলদার, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেলাল হোসেন প্রমুখ। মো. টুটুল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা নিজেদের ভোট নিয়েই ব্যস্ত আছি। মেয়র প্রার্থীর ভোট নিয়ে মাথাব্যথা নেই। নিজে পাস করলে মেয়র কে হবেন, সেটি পরে দেখা যাবে।’

বিএনপিপন্থী আরেকজন কাউন্সিলর প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে এবার আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। এই অবস্থায় দলীয় মেয়র প্রার্থীর হয়ে কাজ করছি জানতে পারলে হয়তো আমিও ফেল করব। তাই ভোটাররা মেয়র পদে কাকে ভোট দেবে, সেটি না ভেবে আমারটা নিয়েই ব্যস্ত আছি।’ অন্যদিকে, আওয়ামী লীগপন্থী এক কাউন্সিলর প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই ওয়ার্ডে কখনোই আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সহজে জিততে পারেন না। এই অবস্থায় ভোটের হিসাব-নিকাশ করেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে দলের অনেক নেতাকর্মীও শুধু আমার জন্যই কাজ করছে।’

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী লিটনের নির্বাচন সমন্বয়ক ডাবলু সরকার বলেন, ‘কাউন্সিলর প্রার্থীরাও মেয়র নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখেন। তাই এবার আমরা যেসব স্থানে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী সমর্থন চেয়েছেন, সেসব ওয়ার্ডে কাউকেই সমর্থন দেয়নি। তবে ১৩টি ওয়ার্ডে আমরা একক প্রার্থী দিয়েছি। সেসব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীরা জয়ী হবেন বলে আশা করি। এর বাইরে আওয়ামী লীগপন্থী অন্য কাউন্সিলররা জয়ী হয়ে আসতে পারলে তাঁদের পরে সমর্থন দিব। তবে নির্বাচনের এই সময়ে নয়। তাহলে মেয়র পদে প্রভাব পড়তে পারে।’

অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়ক তোফাজ্জল হোসেন তপু বলেন, ‘কাউন্সিলর প্রার্থীরা যে যার মতো কাজ করছেন। তাঁদের নিয়ে আমরা কোনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছি না