লাঙলের জয়,পরাজয় মেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ, প্রত্যাখ্যান বিএনপির

প্রকাশিত

নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। হলোও তাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার এই সিটিতে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হওয়া নির্বাচনে ভোট প্রদানের হারও ছিল উল্লেখযোগ্য। ৭৪.৩০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। যাতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কোনো রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হলেন জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা।সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই চলে এই ভোটগ্রহণ। গত রাত সোয়া ১২টায় বেসরকারিভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তাতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফা তাঁর নিকটতম আওয়ামী লীগ প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।   ১৯৩টির মধ্যে সব কটি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে জাতীয় পার্টির মোস্তফা (লাঙল) পেয়েছেন এক লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট, আওয়ামী লীগ প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু (নৌকা) ৬২ হাজার ৪০০ এবং বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট।

নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪। ভোট পড়েছে দুই লাখ ৯২ হাজার ৭২৩টি।

ভোট প্রদানের হার ৭৪.৩০ শতাংশ। ভোটাররাও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে খুশি। আর নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। কুয়াশায় মোড়া উত্তরের এ নগরীতে সকালে কনকনে শীতের মধ্যেও ঘর থেকে বের হয়েছিল তারা। রংপুর সিটিতে প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর। আর গতকাল হলো দ্বিতীয় নির্বাচন। তবে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নগরপিতা নির্বাচনের ফলাফলে পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে হারালেও এবার হয়েছে উল্টো।

আগেরবারের নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে কিছুটা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেলেও এবারের নির্বাচনের সে ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। অবশ্য বিএনপির অভিযোগ, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং তাদের প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে সরেজমিনে সে ধরনের কোনো চিত্র দেখা যায়নি।

নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল প্রভাবমুক্ত একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। তবে তারা তা করতে পারায় প্রশংসিত হচ্ছে। এ ছাড়া নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই নির্বাচনকে একটি মডেল নির্বাচন হিসেবে দাঁড় করানোর যে চেষ্টা ছিল, তাতে সফলতা এসেছে বলেই দাবি নির্বাচন কমিশনের। এ ধরনের একটি ভোটের ইতিবাচক প্রভাব আগামী নির্বাচনগুলোতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।

আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা ও রংপুর সিটি নাগরিক কমিটি মনোনীত প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু এক লাখ ছয় হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রার্থী জাতীয় পার্টির মোস্তফাকে ২৬ হাজার ২৫০ ভোটে পরাজিত করেন। মোস্তফা ও জাতীয় পার্টি সমর্থিত আরেক প্রার্থী এ কে এম আব্দুর রৌফ মানিক পেয়েছিলেন যথাক্রমে ৭৭ হাজার ৮৩৫ ও ৩৭ হাজার ২০৮ ভোট। আর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা পেয়েছিলেন মাত্র ২১ হাজার ২৩৫ ভোট। ঝন্টু ওই নির্বাচনে বিজয়ী হলেও জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থী মিলে যে ভোট পেয়েছিলেন তার তুলনায় তা কম ছিল।

এবারও দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এইচ এম এরশাদের ভাতিজা হোসেইন মকুবল শাহরিয়ার স্বতন্ত্র হিসেবে মেয়র প্রার্থী ছিলেন। তবে এতে দলের ভোট তেমন ভাগাভাগি হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সাত মেয়র প্রার্থীর মধ্যে বাকি চারজন হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এ টি এম গোলাম মোস্তফা বাবু (হাতপাখা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সেলিম আখতার (আম), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আব্দুল কুদ্দুস (মই) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ (হাতি)।

সাত মেয়র প্রার্থী ছাড়াও ৩৩ ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১২ এবং ১১টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সিইসির সন্তুষ্টি : রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। গতকাল দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন থেকে নির্বাচন কমিশন এবং এই সিটি নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি ভোটের পরিস্থিতি ভিডিও কনফারেন্সে পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

এই নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কমিশন সন্তুষ্ট কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা সন্তুষ্ট। ’ তিনি বলেন, ‘ভোট খুবই ভালোভাবে হচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। সেখানে আমাদের লোক আছে, কোথাও কোনো ধরনের অভিযোগ পাইনি। ভোটার, কর্মকর্তা ও প্রার্থীদের কারো কাছ থেকে অভিযোগ পাইনি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একটি কেন্দ্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইভিএম ব্যহবহারের চেষ্টা করেছিলাম এবং সেটা প্রয়োগ হয়েছে। কোনো রকম বিচ্যুতি ঘটেনি, কোনো রকম অভিযোগ নেই। ভোটারদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। খুব সুষ্ঠুভাবে ভোটাররা ভোট দিতে পেরেছে, এটা দেখে আমরা অভিভূত। ’

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম সংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মডেল নির্বাচন করার কথা আপনাদের আগে বলেছিলাম। রংপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে; এটি একটি মডেল নির্বাচন হয়েছে। কোনো ধরনের গোলযোগ, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ’

গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের বরাতে রফিকুল ইসলাম বলেন, রংপুরে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পড়বে বলে ধারণ করা হচ্ছে। তবে ভোটের ফলাফল শেষেই চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যাবে।

পরে গতকাল সন্ধ্যায় রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার জানিয়েছিলেন, ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর আগে দুপুরে তিনি পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন।

ইভিএমে ভোট পড়েছে ৬০.৮১ শতাংশ : বিকেলে সিইসি বলেন, নতুন ইভিএম সফল। রংপুরে ১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে একটি কেন্দ্রে নতুন প্রযুক্তির ইভিএমে ভোট হয়েছে। এতে ৬০.৮১ শতাংশ ভোট পড়েছে।

রংপুরের ১৪১ নম্বর বেগম রোকেয়া কলেজ কেন্দ্রের ইভিএমের তদারকিতে থাকা ইসি সচিবালয়ের আইসিটি শাখার মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ হোসেন জানান, কেন্দ্রের দুই হাজার ৫৯ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে এক হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে লাঙল ৬৭৪, নৌকা ৩৩৪, ধানের শীষ ১১৭, মই ২১, হাতপাখা ৬১, আম ৯ এবং হাতি ১১ ভোট পেয়েছে।

কেউ খুশি, কারো মুখ ভার : সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ কেন্দ্র ঘিরে সকাল থেকেই ভিড় ছিল। নগরে অবস্থানরত পর্যবেক্ষক, ভোটার ও সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল এটি। কারণ এ নির্বাচনে এই একটি কেন্দ্রেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে ভোটদানে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ভোটার তথ্য যাচাইয়ের পর বোতাম টিপে নির্ধারিত প্রতীকে ভোট দেওয়া যায় এই ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ পদ্ধতিতে ভোট দিতে গিয়ে অনেকে খুশি ছিলেন। অবশ্য জটিলতায় পড়েন কিছু ভোটার।

তবে ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আজহারুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই ভোটারদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছিল। নতুন এ পদ্ধতিতে ভোট দিতে পেরে প্রায় সবাই খুশি। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রের সামনে নির্দেশনা টানিয়েছি। অনেকে নির্দেশনা অনুসারে মেশিন ব্যবহার করতে পারেননি। ’

সকালে ভোটকেন্দ্রে ইভিএমে ভোট দিয়ে বের হওয়া ভোটারদের কয়েকজন জানায়, পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের পাশের কালো বোতামে চাপ দিতে হয়েছে। সবুজ রঙের একটি বোতামে চাপ দিয়ে ভোট নিশ্চিত করতে হয়। সেটা কেউ কেউ করতে পারেনি।

ভোট দিয়ে কেন্দ্রের সামনে অবস্থানরত আলো জাহান জানান, সারিতে দাঁড়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

ভোটাররা লাইনে দাঁড়ালেও আগে থেকে প্রশিক্ষণ না থাকায় পূর্ব শালবনের বাসিন্দা নদী জানান, পৌনে এক ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। মেশিন কাজ করছিল না।

প্রিসাইডিং অফিসার আশরাফুল ইসলামের মতে, তিনটি বোতামে চাপ দেওয়ার বদলে দুটি বোতামে চাপ দেওয়ায় অনেকে জটিলতায় পড়েন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে ৩১ শতাংশ ভোট পড়ে।

ভোটারদের দীর্ঘ লাইন : ভোটকেন্দ্রগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, নগরের আফানউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়, গোদাশিমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামলী আইডিয়াল টেক্সটাইল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রবার্টসনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সেনপাড়া শিশুমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন।

গোদাশিমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার ছিল এক হাজার ৮৯০ জন। পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের কলাবাড়ী ও গোদাশিমলা গ্রামের বাসিন্দা তারা। ২০১২ সালে রংপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ওই গ্রাম দুটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ভোট দিতে আসা কলাবাড়ীর ভোটার এন্তাজ মিয়া ও মহব্বত আলী জানান, আগে থেকেই এ ভোট নিয়ে উৎকণ্ঠা ছিল। কিন্তু কোনো ঝামেলা ছাড়াই খুব শান্তিপূর্ণভাবে তাঁরা ভোট দিতে পেরেছেন।

কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার নিয়ামুল তানভীর দুপুর ১২টায় জানান, তখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ ভোটারের ভোট পড়েছে।

রবার্টসনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার দুই হাজার ৭৪১ জন। সেখানকার প্রিসাইডিং অফিসার নাজমুল আলম দুপুর সোয়া ১২টায় জানান, তখন পর্যন্ত এক হাজার ১৭৫ জন ভোটার ভোট দিয়েছে।

বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মশিউর রহমান জানান, কেন্দ্রে ভোটার এক হাজার ৯৬৩। দুপুর ২টা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দেন।

ভোট দিতে আসা কোবারু গ্রামের রেশমা বেগম বলেন, ‘ভোট দেওয়া নাগবে, ফির বাড়ির কামও করা নাগবে। সেই বাদে সকালোত ভোট দিবার আচ্ছু। ’

সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এলাকা কলাবাড়ীর বাসিন্দা জমসু মামুদ (৭৫)। হাঁটাচলা করতে পারেন না। কথাও বলতে পারেন না ঠিকমতো। কিন্তু ছেলের কোলে চড়ে দুপুর ১২টার দিকে গোদাশিমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন।

তাঁর ছেলে বেলাল হোসেন জানান, অল্পদিন হয় তাঁর বাবার এই অবস্থা। তবে কিছুদিন থেকে তিনি আকার-ইঙ্গিতে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন। তাই কষ্ট হলেও বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ কোলে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসেন বেলাল।

তিন মেয়র প্রার্থী ভোট দিলেন : সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে নগরীর আলমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘কোনো অভিযোগ নেই, ভোট হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে। ’ ভোট দেওয়ার পর হাসিতে উজ্জ্বল মোস্তফা জানান, জয়ী হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বেশি নজর দেবেন। প্রথমেই যানজট নিরসন করবেন।

পরে সকাল পৌনে ১০টায় নগরীর গুপ্তপাড়ার সালেমা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। ভোট দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মার্কা দেখে ভোটাররা ভোট দেবে। ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ। ’

এর একটু পর নগরীর দেওয়ান টুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা।

জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর আগে সকাল ৯টার দিকে নিউ সেনপাড়ায় শিশুমঙ্গল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ভোট দেন। এরশাদের সঙ্গে ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী জি এম কাদের।

ভোট দেওয়ার পর এরশাদ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ করে কোনো অনিয়মের আশঙ্কা উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘কোথাও অনিয়ম নেই। কোথাও কোনো গোলমাল হওয়ার আশঙ্কাও নেই। কারণ এ নির্বাচন ইসির জন্য পরীক্ষা। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে। রংপুরে লাঙলের জোয়ার বইছে। লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে আমাদের প্রার্থী জিতবে বলে আশা করেছিলাম। তা-ই হবে। ’

সকাল ৮টায় ভোট শুরুর সময় কনকনে শীত ও কুয়াশা বেশি ছিল নগরীর আশপাশের বর্ধিত অংশে গ্রামের দিকে। মূল নগরীর তুলনায় বর্ধিত অংশে (গ্রামাঞ্চল) ভোটারদের উপস্থিতি ছিল বেশি।

আগের দিন থেকে ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে প্রার্থীদের পোস্টারে ছেয়ে যায়। ভোটকেন্দ্রগুলো ঘিরে অস্থায়ী খাবারের দোকানে জমে ওঠে বেচাকেনা, যেন ভোট উৎসবে বসে গ্রামীণ মেলা।

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার বেড়ে যায়। কেন্দ্রগুলোয় নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কেন্দ্রে পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি কমে নারী ভোটারদের উপস্থিতি উজ্জ্বল হতে থাকে। দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ভোট দেন তাঁরা। প্রার্থীরা নারীদের ভোটদানে উৎসাহ দিয়েছেন।

গতকাল নগরীতে যান চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। পথে পথে ছিল বিজিবি-র‌্যাবের টহল। ভোট দিয়ে সকাল সকাল বাড়ি ফিরছিলেন অনেকে। জাহাজ কম্পানি মোড়ে পত্রিকা বিক্রেতা আকবর কবির পিন্টু বলেন, ‘সকাল পৌনে ৯টায় জুম্মাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিয়েছি। কেন্দ্রে তখন ছিল ৭০-৮০ জন ভোটার। ’

লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, নারী ভোটাররাই বেশি। রংপুর মহিলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজনীন রহমান জানান, দলীয় প্রতীকে ভোট দিয়ে ভালো লাগছে। সেনপাড়ার বাসা থেকে হেঁটে তিনি ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। জি এল রায় রোডে তখন ভোটারদের ভিড়। সেখান থেকে হেঁটে শালবনের দিকে যেতে যেতে কথা হয় হাবিব বাবুর সঙ্গে। তিনি জানান, ভোট দিতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

সরকারি রোকেয়া কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন শালবন ও নিউ শালবন এলাকার ভোটাররা। মোট ছয়টি কক্ষে ভোট নেওয়া শুরু হয়। ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দিয়ে আলো বেগম বলেন, ‘বোতাম টিপে ভোট দিয়েছি। ভালো লাগছে। ’

পূর্ব শালবনের বাসিন্দা শারমিন সুলতানা ওই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জানান, পরিবারে পাঁচজন ভোটার, সবাই ভোট দেবেন।

ফল প্রত্যাখ্যান বিএনপি প্রার্থীর : রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যাপক হারে কারচুপি হয়েছে দাবি করে তিনি এই ফল প্রত্যাখ্যান করেন। গতকাল রাত ১০টার দিকে জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন কাওছার জামান বাবলা। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। জীবনের ঝুঁকির কারণে অনেক মানুষই ভোট দিতে যায়নি।

বাবলা জানান, ইভিএম ব্যবহার করা একমাত্র কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে একাধিক কেন্দ্রে অনিয়ম সম্পর্কে রিটার্নিং অফিসারকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, অনেক ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে। আর সে কারণেই তিনি এই নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আনন্দ-উল্লাসে মিষ্টি বিতরণ : চূড়ান্ত ফল ঘোষণা না হলেও বেসরকারি ফলাফলে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা অনেক এগিয়ে থাকায় রাতে আনন্দ-উল্লাসসহ মিষ্টি বিতরণ করেছে দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরা।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply