লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যাঃ মাদারীপুরেরই ১৩ যুবকের প্রানহানির শংকা, পরিবারগুলোজুড়ে আহাজারি

প্রকাশিত
মাদারীপুর সদর প্রতিনিধি-
লিবিয়ায় গুলি করে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে মাদারীপুর জেলারই ১৩ যুবক বলে জানা গেছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া জেলা প্রশাসকের তালিকাসহ বিভিন্ন সুত্রে বিষয়টির নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে প্রিয়জনের এই নির্মম প্রানহানির ঘটনায় পরিবারগুলো আহাজারি নেমে এসেছে। দেনায় জর্জরিত পরিবারগুলো দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবী করেছেন। এদিকে হত্যাকান্ডের শিকার যুবকসহ শত শত যুবককে জিম্মি করে লিবিয়ায় বাংলাদেশী প্রতারক চক্র মাফিয়া সেজে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে । এক্ষেত্রে চক্রটি যুবকদের জিম্মি করে ভয়াবহ নির্যাতনের অডিও ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এমনই কয়েকটি ক্লিপে উঠে এসেছে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা।
সরেজমিনে জানা যায়, ৬ ভাই বোনের সংসারের জুয়েল হাওলাদার (২২) সোনার হরিনের আশায় ৪ মাস আগে জুলহাস ও জাকির দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমায় লিবিয়ায়। ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে নেয়া হয় জুয়েলকে। লিবিয়ায় পৌছে যায় জুয়েল। পৌছেই যেন পড়েন গোলকধাধায়। শুরু হয় মাফিয়া নাটক। মাফিয়া অপহরন করেছে বলে আসে ফোন । নির্মম নির্যাতনের অডিও ক্লিপ শুনিয়ে চাওয়া হয় আরো ১২ হাজার ডলার বা ১০ লাখ টাকা। দফায় দফায় নির্যাতনের ক্লিপ মা ও বাবাকে শুনিয়ে ধার দেনা কিস্তি হাওলাদ করে সে দেশের মাফিয়া গ্যাং আমির ও আবদুল্লাহর হাতে এদেশের দালালের মাধ্যমে দেয়া হয় দাবীকৃত টাকা। এরইমাঝে খবর আসে ২৬ জনের মৃত্যুর। শুধু জুয়েলই নয় চাচাতো ভাই পাশের গ্রামের মানিক হাওলাদার স্ত্রী সন্তানের জন্য সুখের ঠিকানা করতে গিয়ে পড়েন একই চক্রের হাতে। মুক্তিপন দেন ১০ লাখ টাকা। আর একইসময় খবর আসে মর্মান্তিক । তালিকায় হতভাগ্যরা হলেন রাজৈর উপজেলার হোসেনপুরের আবদুর রহিম, বিদ্যানন্দী গ্রামের জুয়েল হাওলাদার (২২) একই গ্রামের মানিক হাওলাদার (২৮), টেকেরহাট এলাকার আসাদুল, মনির হোসেন ও আয়নাল মোল্লা, ইশিবপুর এলাকার সজীব ও শাহীন, সদর উপজেলার জাকির হোসেন, জুয়েল হোসেন, সৈয়দুল, ফিরোজ ও দুধখালীর শামীম। অনেক পরিবারের লোকজন জানেও না তাদের সন্তান আদৌ বেঁচে আছে কি না। অনেকে আবার হত্যাকান্ডের খবরও শোনেনি। নিখোঁজ যুবকদের সঠিক পরিচয় না পাওয়ায় তাদের পরিবারকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আহত মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে গিয়েও মিলে নির্মমতার সেই ক্লিপ।
এদিকে লিবিয়ায় হতাহতের ঘটনার খবর শুনে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাংলাদেশি দালাল রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মজিদ শেখের ছেলে জুলহাস শেখের বাড়িতে হামলা করে নিখোঁজ যুবকদের অভিভাবক ও এলাকাবাসী। এ খবর পেয়ে রাজৈর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের কাছে দালাল জুলহাস শেখ নিজেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে পরিচয় দেয়। এ সময় পুলিশ জুলহাসকে নিয়ে মাদারীপুর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে
নিখোজ জুয়েলের দুলাভাই মশিউর রহমান বলেন, জুয়েলের কোন খবরই আমরা পাচ্ছি না। যে ক্যাম্পে গুলি হইছে ও সেই ক্যাম্পেই ছিল। লিবিয়া থেকে একজন ফোন করে বললো ও নেই। ওর মা বাবাসহ কাউকেতো কিছু বুঝাতেই পারছি না।
নিখোঁজ জুয়েল হাওলাদারের পিতা রাজ্জাক হাওলাদার ও মা রহিমা বেগম বলেন, “আমাদের ছেলেসহ রাজৈরের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজনকে দালাল চক্র লিবিয়া নেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪/৫ লাখ টাকা চুক্তি করে নিয়ে যায় ৩/৪ মাস আগে। তারপর লিবিয়ার ত্রিপলী না নিয়ে বেনগাজী নামে এক গ্রামে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। এরপর ভয়েজ রেকর্ডে নির্যাতনের শব্দ পাঠিয়ে আরো ১০ লাখ টাকা দাবী করে। আমরা হোসেনপুর জুলহাস শেখ নামের ওই দালালের বাড়িতে গিয়ে ১০ লাখ টাকা দিয়ে আসি। মানুষের কাছে শুনতে পাচ্ছি লিবিয়ায় গুলি করে অনেক বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের ছেলে বেঁচে আছে কি না তাও জানতে পারছি না। এখন পর্যন্ত ছেলের কোনো খোঁজ পাই নাই।”
একই গ্রামের নিখোঁজ মানিক হাওলাদারের পিতা শাহ আলম হাওলাদার বলেন, “আমার ছেলে মানিককে লিবিয়া নেওয়ার কথা বলে দালাল জুলহাস আমার কাছ থেকে প্রথমে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে ছেলেকে বেনগাজী আটকে রেখে ভয়েজ রেকর্ডের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দাবী করে। আমি আমার ছেলেকে আনতে জুলহাসের বাড়ি গিয়ে টাকা দিয়ে আসি। এখনো আমার ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।”
তার স্ত্রী কাদতে কাদতে বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গেল । সেই স্বপ্ন কি আর পূরন হলো না। এদেশের চক্রই ওই দেশে মাফিয়া সেজে একাজগুলো করছে।
রাজৈর থানার ওসি শওকত জাহান বলেন, “লিবিয়ায় লোক নেয়া দালাল রাজৈরের জুলহাস শেখের বাড়িতে এলাকাবাসী হামলা করে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা ওই বাড়িতে গেলে জুলহাস বলে আমার করোনা হয়েছে। করোনার কথা শুনে আমরা জুলহাস শেখকে মাদারীপুর সদর হসাপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি করি।”
মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীদের হত্যার কথা শুনেছি। যাদের মধ্যে মাদারীপুরের লোকজনই বেশি। মাদারীপুরের কতজন মারা গেছে এ তথ্য আমি এখন পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয় থেকে পায়নি। মন্ত্রনালয়ে আমি যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে আমাকে মাদারীপুরের কতজন মারা গেছে সে তথ্য দিবে। লাশ দ্রুত কিভাবে দেশে আনা যায় আমি সে বিষয়ে মন্ত্রনালয়ের সাথে কথা বলেছি।”