শোক দিবস পালন করতে টঙ্গীতে চলছে চাঁদাবাজি॥ অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক :
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে গাজীপুরের টঙ্গীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ১৫ আগস্টে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর কতিপয় নেতাকর্মী সরাসরি অথবা তাদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং ছোটখাটোসহ বিভিন্ন ব্যবসায়দের কাছে চাঁদা দাবী ও আদায়ের অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার বেদনাবিধূর এই দিনটিতে দোয়া ও মিল্লাদের মাধ্যমে শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়। কেন্দ্রিয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগেভাগেই গণমাধ্যমের মাধ্যমে সতর্কতা জানিয়েছেন। বলেছেন, কেউ চাঁদা চাইলেই তাদেরকে জানানো হয়। একই সাথে গাজীপুর ২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, কেন্দ্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাড মো.আজমত উল্লাহ খান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড জাহাঙ্গীর আলমের নির্দেশ রয়েছে ১৫ ই আগস্টকে কেন্দ্র করে কোন দলীয় নেতাকর্মী কোথাও যেন চাঁদাবাজি না করেন।
অথচ টঙ্গীতে দলের এ নির্দেশ অমান্য করে নানা কৌশলে চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টঙ্গীর ছোট বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন মার্কেট, কিন্ডারগার্ডেন স্কুলসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকেও চাঁদা দাবি ও আদায় করা হচ্ছে। বিভিন্ন হয়রানির ভয়ে থানায় বা আওয়ামীলীগের কেন্দ্রিয় বা মহানগর নেতাদেরকে জানাচ্ছেন না স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীগের তথ্য অনুযায়ী নগরীর ৪৫নং ওয়ার্ডে চাঁদা তুলছেন ওয়ার্ড যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের পদধারী নেতারা। এছাড়াও নগরীর ৫৫ নং ওয়ার্ডের মিলগেট এলাকায় যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত সোমবার চাঁদার টাকা দিতে গড়িমসি করায় একজন আওয়ামীলীগ নেতা ও একজন স্বেচ্ছাসেবকলীগ এবং যুবলীগ নেতার নির্দেশে ২০/২৫ জন যুবক জামাই বাজার এলাকার মুদি দোকানি মনির মোল্লা, কামাল মোল্লা ও জামাল মোল্লার দোকানের মালামাল ফেলে দিয়ে দোকানের সাটার বন্ধ করে দেয় এবং তাদের উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং প্রথমে ৫০ হাজার পরে ৪০ হাজার টাকা দাবী করে গালাগাল করে।
এছাড়াও জামাই বাজার এলাকার আসমা কিন্ডারগার্ডেনের মালিকের কাছে শোক দিবসের কাঙ্গালি ভোজের জন্য একটি গরু, জামাইবাজার এলাকার রব হাজীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। এ সময় রব হাজীর বাড়ির এক রং মেস্তরি ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতা চড় মারেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়াও হাজী আবুল কালামের কাছে ৫০ হাজার টাকা, কুমিল্লা বেকারি থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবী করলে ৫ হাজার টাকা দিয়ে আপোষ হয় ও বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিভিন্ন হারে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।
যারা বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত তাদের কাছেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। জামাই বাজার এলাকার সবদর আলীর ছেলে ছাত্রদল নেতা আল-আমিনের বাসায় লোকজন নিয়ে একটি গরু দাবি করা হয়েছে। গরু না দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা দিতে বলা হয় তাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে চাঁদাবাজি করে থাকে, এটি নতুন কিছু নয়। তবে এ বছর দিবসটিকে সামনে রেখে চাঁদার যে অর্থ ধার্য করে দেওয়া হচ্ছে সেটি এর আগে কখনও হয়নি।
চাঁদা চাওয়া হয়েছে এমন একজন বলেন, ‘আমরা নিজেরাও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি, আওয়ামী লীগকে ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের কাছে যে পরিমাণ চাঁদা দাবি করা হচ্ছে তা বেমানান। জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব চাঁদাবাজির ফলে বর্তমান সরকার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে শ্রমিক লীগ নেতা ও নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলসের চেয়ারম্যান মতিউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গত কয়েক বছর ধরে শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাজীপুর মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডে কাঙালি ভোজের জন্য গরু ও আর্থিক অনুদান দিতেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নবনির্বাচিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম।
এ বিষয়ে অ্যাড. জাহাঙ্গীর আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আওয়ামীলীগের কোনো নেতাকর্মী চাঁদা দাবি করলে আমাদের তথ্য দিন, আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেব। আর আওয়ামীলীগ সহযোগী সংগঠনের কেউ চাঁদা আদায় করলে স্ব স্ব ইউনিট তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। মেয়র আরো বলেন, আমি প্রতি বছর শোক দিবসে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নগরীর প্রত্যেক ওয়ার্ডে তবারকের ব্যবস্থা করে থাকি। এবছরও আমি চেষ্টা করবো সাধ্যমতো তবারকের ব্যবস্থা করার।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড.আজমত উল্লাহ খান মুঠোফোনে বলেন, দলীয়ভাবে আমরা ওপেন মিটিংয়ে বলেছি কেউ কোথাও শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদাবাজি করতে পারবে না। যেহেতু আপনার মাধ্যমে এখন আমি বিষয়টি জেনেছি, খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জেনে তারপর এ বিষয়ে মন্তব্য করব।
টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.কামাল হোসেন বলেন, ১৫ আগস্টকে ঘিরে কোনো চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখনও পর্যন্ত আমরা কোনো চাঁদাবাজির অভিযোগ পাইনি।
##