সন্তানকে স্কুলে দিয়ে প্রবাসীর কাছে চলে গেলেন গৃহবধূ

প্রকাশিত

স্যার, আমার স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়েছে। সকালে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছে, এখনো ফিরে আসেনি।’-নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে এসে ঠিক এভাবেই স্ত্রী অপহরণের অভিযোগ করেছিলেন নগরের বায়েজিদ এলাকার মুদি দোকানদার জামাল হোসেন (ছদ্মনাম)। অভিযোগের রহস্য উম্মোচন শেষে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, জামালের স্ত্রী দুই সন্তান রেখে স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিলেন প্রবাসী যুবকের কাছে। শুধু তাই নয়, স্বামীর বাসা ছেড়ে প্রবাসীর বাসায় উঠার আগে ওই গৃহবধূ নিজের ব্যবহার্য বেশ কিছু জিনিসপত্রও কৌশলে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

কথিত অপহরণের শিকার গৃহবধূ পলি আক্তারকে (ছদ্মনাম) উদ্ধারের পর ঘটনার আদ্যেপান্ত জানতে পারেন গোয়েন্দা পুলিশের (পশ্চিম) সহকারী কমিশনার মঈন ইসলাম। তিনি তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় ওই উদ্ধার অভিযান চালিয়েছিলেন গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।

ঘটনার বিষয়ে মঈন ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামাল হোসেন গোয়েন্দা কার্যালয়ে এসে অভিযোগ করেন, তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়েছে। ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিল স্ত্রী। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় ফেরেনি। ছেলের স্কুল টাইগারপাস এলাকায়। পরে তাঁর স্ত্রীর বিষয়ে আরো তথ্য নেওয়ার সময় জামাল হোসেন দাবি করেন, স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর চমৎকার সম্পর্ক। দাম্পত্যজীবনে তাঁরা খুব সুখী। কোনো ধরনের কলহ-বিবাদ নেই। শুধু তাই নয়, জামাল হোসেন ঘরে না ফেরা পর্যন্ত স্ত্রী পলি আক্তার ভাত পর্যন্ত খায় না।’

এমন সুখী সংসারের গৃহবধূ লাপাত্তা হবেন কেন?-এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে টাইগারপাস এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালায়। কিন্তু ওই দিন সকালে ওই এলাকা থেকে কেউ অপহৃত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য জানতে পারলেন না গোয়েন্দারা। আশপাশের এলাকার ভিডিও ফুটেজের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়। তাতেও লাভ হয়নি। শেষে জামাল হোসেনকে প্রশ্ন করা হয়, তাঁর স্ত্রীর হাতে স্মার্টফোন আছে কি না এবং স্ত্রী ফেসবুক ব্যবহার করেন কি না?-এমন প্রশ্নের জবাবে জামাল হোসেন জানান, স্ত্রীকে তিনি ভালোমানের স্মার্টফোন কিনে দিয়েছেন এবং ফেসবুক ব্যবহার করেন।

এবার গোয়েন্দারা প্রযুক্তির সহযোগিতায় ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে। পর্যালোচনার একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, পলি একটি মোবাইল ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। ওই নম্বরের সূত্র ধরে অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় পলি বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় অবস্থান করছেন।

এবার গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালায় বায়েজিদ বোস্তামী থানার অদূরের একটি বাসায়। কৌশলে ওই বাসায় পুলিশ প্রবেশ করে। অভিযানকারী দলের নারী পুলিশ সদস্যরা একটি কক্ষে গিয়ে পলি আক্তারকে উদ্ধার করেন। ওই অভিযানের সময় গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, নাসির উদ্দিন (ছদ্মনাম) নামের একজন ওই দিনই প্রবাস থেকে দেশে ফিরেছেন। পলি আক্তার স্বামীর বাসায় ছেড়ে এই নাসিরের বাসায় উঠেছেন। আর পলিকে বিয়ে করতেই নাসির ফিরেছেন দেশে।

উদ্ধারের পর গোয়েন্দা কার্যালয়ে আনা হয় পলি আক্তার, প্রবাস ফেরত নাসির ও তাঁর মা ফাতেমা বেগমকে (ছদ্মনাম)। সঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে গোয়েন্দা কার্যালয়ে হাজির হন জামাল হোসেনও।

এবার জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসে। পলিকে অপহরণের পর বাসায় রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়েন্দা পুলিশকে নাসির উদ্দিন জানান, তিনি বিদেশে থাকেন। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় পলির সঙ্গে। একপর্যায়ে তাঁরা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সম্পর্কের শুরুতেই পলি নিজের বিয়ে ও দুই বাচ্চা থাকার বিষয়টি গোপন করেছিলেন। কিন্তু প্রেম গভীর হওয়ার পর যখন বিয়ে সংক্রান্ত আলাপ হচ্ছিল, তখন পলি জানান, তাঁর দুই সন্তান আছে। দীর্ঘদিন প্রেমের পর নাসির সিদ্ধান্ত নেন, দুই সন্তানের জননীকে তিনি বিয়ে করবেন। এই কারণে পলিকে বলেছিলেন, দেশে এসে পলিকে বিয়ে করবেন। পলি যেন আগে থেকে তাঁদের বাসায় গিয়ে উঠেন। এ বিষয়ে নাসির তাঁর মা ফাতেমাকে বেগমের সঙ্গেও কথা বলেন। একমাত্র ছেলে নাসির দুই সন্তানের জননীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মা ফাতেমা বেগম ছেলেকে নিষেধ করতে পারেননি। এ কারণে পলির সঙ্গে ফাতেমা বেগম কথা বলতেন।

ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা বলে পলি এবং নাসির তাঁদের বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করেন। সেই লক্ষ্যে ফাতেমা বেগমের বাসায় কিছু কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিতে থাকেন পলি। এরপর একদিন বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে তিনি চলে যান নাসিরের বাসায়। তাঁকে কেউ অপহরণ করেননি।

স্ত্রী পলির মুখে এমন কথা শুনে আকাশ ভেঙে পড়ে স্বামী জামাল হোসেনের ওপর। তিনি আর নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারেন না। চুপসে যান। গোয়েন্দাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি নীরব থাকেন। স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী দুই সন্তান ছেড়ে অন্যের ঘরে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি জামাল হোসেন।

ভালোবাসার সংসার ছেড়ে কেন প্রবাসী নাসিরের সঙ্গে নতুন ঘর বাঁধার পরিকল্পনা?-গোয়েন্দাদের এমন প্রশ্নের জবাবে পলি আক্তার জানান, জামাল হোসেন অতীতে একবার বিয়ে করেছিলেন। সেই কথা না জানিয়ে পলি আক্তারকে বিয়ে করেছিলেন। সেই কারণে জামালের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন তিনি। তাই নাসিরের সঙ্গে নতুন ঘর বাঁধার পরিকল্পনা করেছিলেন পলি। এবার গোয়েন্দা পুলিশ দুই সন্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পলি ও জামাল হোসেনকে অনুরোধ জানান। জামালকে ডিভোর্স দিয়ে নাসিরকে বিয়ে করতে পলির আইনগত সমস্যা নেই। কিন্তু সন্তানদের কী হবে? এমন প্রশ্নে চুপসে যান পলি। নাসিরকেও গোয়েন্দারা প্রশ্ন করেন, পলির দুই সন্তানের কী হবে? তখন নাসির বলেন, ‘আমি প্রেমের সম্পর্ককে বিয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা দিতেই পলিকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম। এখন পলিকে বিয়ে করলে দুই সন্তান মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হবে, সেটাও আমি চাই না। তাই আমি পলিকে বিয়ে করব না।’

এবার তিন পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে গোয়েন্দা পুলিশ বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। ফলশ্রুতিতে দুই সন্তানকে নিয়ে পুনরায় জামাল হোসেনের সঙ্গে বাসায় ফেরেন পলি আক্তার। আর প্রেমিকাকে ছাড়াই মাকে নিয়ে বাসায় ফিরে যান প্রবাসী নাসির।

এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (পশ্চিম) মঈন ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব সমাজে কতোটা ভয়ঙ্করভাবে পড়ছে, তা অকল্পনীয়। সমাজের প্রত্যেক স্তরেই ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হওয়ার আগে শতবার চিন্তাভাবনা করা উচিত। নিজেকে এবং পরিবারকে নিরাপদে রাখার স্বার্থে সর্বোচ্চ সচেতনতার সঙ্গে ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হওয়া উচিত।’