সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা: উৎসের খোঁজে আর্থিক গোয়েন্দারা

প্রকাশিত

বাংলাদেশিদের টাকা কিভাবে সুইস ব্যাংকে গেলো—তার উৎসের সন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওই টাকা ওভার ইন ভয়েস কিংবা আন্ডার ইন ভয়েসিংয়ের মাধ্যমে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর বাইরে বিটকয়েনের মতো কোনো ডিজিটাল কারেন্সির মাধ্যমে এই অর্থ পাচার করা হয়েছে কি না, তাও বিবেচনা করছেন গোয়েন্দারা।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে সুইস ব্যাংকের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ শুরু করেছে বিএফআইইউ। এই ইস্যুতে একাধিকবার মেইল চালাচালি হয়েছে। তবে, উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি না থাকায় বিএফআইইউ’কে এখনই কোনো তথ্য দিতে পারছে না সুইস ব্যাংক।

এই পরিস্থিতিতে অর্থপাচার বা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য জানতে সুইস ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির (এমওইউ) পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পেলে চুক্তি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।

অনুসন্ধান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান বলেন, ‘আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বসে নেই। আমরা খতিয়ে দেখছি। সুইস ব্যাংকের সঙ্গেও যোগোযোগের চেষ্টা করছি। এছাড়া, অর্থপাচার প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই বিএফআইইউ থেকে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও সতর্কতার সঙ্গে লেনদেন করতে  নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

সুইস ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দুই দফা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সিদ্ধান্ত  নিতে দেরি হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন,  ‘আমাদের চুক্তির পথে যেতে হবে। ভারতও চুক্তি করেছে। তাই ভারতের প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা হচ্ছে’

উল্লেখ্য, প্রতিবছরই নির্দিষ্ট তারিখে সুইস ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আমানতকারীদের আমানত সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এবার প্রকাশ করেছে গত চলতি বছরের ২৫ জুন।  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালে বাংলাদেশিরা সুইস ব্যাংকে মোট ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক জমা রেখেছেন। যার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্র্যাংক ৯০ টাকা হিসাবে)। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ১২ জুন সতর্কতামূলক তৎপরতার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। পদক্ষেপ হিসেবে  বিএফআইইউ থেকে অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন সংক্রান্ত সার্কুলারও জারি করা হয়।

বিএফআইইউ-সূত্রে জানা গেছে, পাচারকারীদের টাকার উৎস খুঁজতে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের নজর প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখার সন্দেহজনক লেনদেনের দিকে।  প্রত্যেক ব্যাংক শাখায় নমুনাভিত্তিতে ৪/৫ জন গ্রাহকের এলসি ডকুমেন্টসহ হিসাবের নথি খতিয়ে দেখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহজনক প্রত্যেক এলসির বিপরীতে পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা বারবার পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। এছাড়া এলসির সাপ্লাইয়ার, বেনিফিশিয়ারি ও ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহ করে তা পুনঃপর্যালোচনা করতে শাখাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বিএফআইইউ। এর বাইরে ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড রেমিটেন্স সংক্রান্ত লেনদেনেও নজর রাখতে বলা হয়েছে।

এদিকে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর অরগানাইজড ক্রাইম ইউনিটের ডিআইজি (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ইন্টিলিজেন্স) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘অর্থপাচারে বিষয়ে আমাদের কাছে যখনই তথ্য আসে, তখনই অনুসন্ধান করি। সত্যতা পেলে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করি। মামলার পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, ‘সম্প্রতি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনুসন্ধান চলছে।’  সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পেলে ‘ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মালিকের’ বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও তিনি জানান।