স্বপ্নে আদিষ্ট স্ত্রীকে ১৭লাখ টাকায় হাতি কিনে দিলেন এক কৃষক!

প্রকাশিত

প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি-
স¤্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর জন্য আগ্রার তাজমহল তৈরী করে দিয়েছেন। বাদশা শাহজাহানের মতোই স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায়, স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণ করতে এবার জমি বিক্রি করে সাড়ে ১৬ লাখ টাকা দিয়ে হাতি কিনে দিলেন এক কৃষক। এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে, সম্প্রতি কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট সিমান্তবর্তী এলাকার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রথিধর দেউতি গ্রামে। এখবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের ভালবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং একনজর হাতি দেখতে লোকজন ছুটে আসছে দুর-দুরান্ত থেকে।
হাতির মালিক দুলাল চন্দ্র রায়(৪৮) কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট সিমান্তবর্তী এলাকার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রথিধর দেউতি গ্রামের মৃত বীরেন্দ্র নাথের পুত্র। তার স্ত্রী তুলসী রানী দাসী (৪৫) একজন কালিমাতা সাধক। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ধ্যানে মগ্ন হন। দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসে তার কাছ থেকে অন্ধ চিকিৎসা গ্রহন করেন। এ কারণে ধ্যান মগ্ন স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নানান বায়না পূরণ করতে থাকেন স্বামী দুলাল চন্দ্র রায়। এরকম ১বছর আগে স্ত্রীর বায়নায় রাজহাঁস খরগোস ও ঘোড়া কিনে আনেন দুলাল চন্দ্র রায়।
এলাকাবাসীরা জানান, দৈব নির্দেশ (স্বপ্নে আদিষ্ট) পেয়ে কৃষক দুলাল চন্দ্রের স্ত্রী তুলসী রানীদাসী (৪৫) ওই দৈব নির্দেশ পালনে কয়েক বছর আগে স্বামীর কাছে প্রথমে একটি রাজহাঁস ও ২টি খরগোস, ছাগল ও ২টি ঘোড়া কিনে আনেন। এর মধ্যে একটি খরগোস ও একটি ঘোড়া পরিচর্যার অভাবে মারা যায়। এক বছর আগে আবারো দৈব নির্দেশ পান হাতি কিনে যতœ নেয়ার। এ নির্দেশনা পেয়ে পুনরায় স্বামী দুলালের কাছে হাতি কিনতে বায়না ধরেন তুলসী রানী।
স্ত্রীর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ১১ বিঘা জমির সাড়ে ৩ বিঘা জমি বিক্রি করে হাতি ক্রয়ের পরিকল্পনা নেন দুলাল চন্দ্র। শুধু পরিকল্পনা করেই থেমে থাকেননি বরং খোঁজ-খবর নিয়ে সিলেটের মৌলভীবাজার গিয়ে গত ১৪সেপ্টেম্বর সোমবার সাড়ে ১৬ লাখ টাকায় হাতি কিনেন তিনি।
২২ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়ে হাতি নিয়ে গত সপ্তাহে বাড়ি ফিরে কৃষক দুলাল। এসময় হাতিকে দেখভাল করতে ইব্রাহিম মিয়া নামের এক মাহুতকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে মৌলভীবাজার থেকে নিয়ে আসে।
গ্রামের সাধারণ একজন কৃষক দুলাল চন্দ্র হাতি কিনে এনেছেন শুনে শুধু ওই গ্রামবাসী নয়, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন হাতিটি দেখতে ভিড় করছেন দুলাল-তুলসী দম্পতির বাড়িতে।
২২সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দুলাল চন্দ্র রায়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার প্রতিবেশী সচিন চন্দ্রের বাড়ির উঠানে একটি মাদী হাতি বান্ধা। পাশে বহু দর্শনার্থী হাতি দেখতে ভিড় জমিয়েছে। দুলাল চন্দ্রের বাড়িতেও লোকজন ভিড় করছে। তবে হাতি দেখতে নয়। দুর-দুরান্ত থেকে আসা রোগী ও রোগীর অভিভাবক ধ্যানমগ্ন তুলসী রানী দাসির শ্রবন বাণি শুনতে এসেছে। চিকিৎসা নিচ্ছে। নানান ধরনের রোগী চিকিৎসা চলছে এ বাড়িতে। এর মাঝে এক রোগীর অভিভাবক হাতির কাছে এসে ১’শ টাকা দিয়ে যান। রোগীদের দর্শনী নেন ২০/৫০ টাকা।
ওই গ্রামের সচিন চন্দ্র বলেন, অনেক দিন ধরে শুনি দুলাল চন্দ্র হাতি কিনবেন। অবশেষে জমি বিক্রি করে তিনি স্ত্রীর কথামতো হাতি কিনে এনেছেন। সেই হাতি দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ বাড়িতে ভিড় করছে।
হাতি দেখতে আসা কুড়িগ্রাম থেকে ইউসুফ আলমগীর, টুলময়ী(৯৫)সহ অনেকে বলেন, জীবনে অনেকবার হাতি দেখেছি। তবে স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে কেউ হাতি কিনেছেন সেটা শুনে দেখতে এসেছি।
হাতির মাহুত ইব্রাহিম বলেন, খাওয়া থাকাসহ প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা মজুরিতে মৌলভীবাজার থেকে এসেছি। এছাড়া মাহুত বানাতে স্থানীয় দুইজনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তারা শিখলে আমি চলে যাবো।
হাতির মালিক দুলাল চন্দ্র রায় বলেন, স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে, তাকে খুশি করতে জমি বিক্রি করে সাড়ে ১৬ লাখ টাকায় হাতিটি কিনেছি। হাতিটির দেখভাল করতে মৌলভীবাজার থেকে মাহুতকে নিয়ে এসেছি, যাতে হাতির পরিচর্যায় কোনো কমতি না হয়। আপাতত হাতির পেছনে মাহুতের মজুরি এবং কলাগাছের জন্য দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ হচ্ছে।
২২সেপ্টেম্বর পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ দেলোয়ার হোসেন মাষ্টার বলেন, গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক তার স্ত্রীর জন্য হাতি কিনেছে। তবে হাতি কিনলে তো হবে না তার খোরাক দিতে হবে। এগুলো আসবে কোথা থেকে? তাদের তো বাড়তি ইনকাম নেই। শুধু হাতির মাহুতের পিছনে মাসে ২২হাজার টাকা খরচের কথা শুনেছি। পোষ্য হাতি হিসেবে বন বিভাগের কাগজও তাদের রয়েছে। এভাবে স্ত্রীর চাহিদা পূরন করতে গেলে একসময় হয়তো পরিবারটি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

Be the first to write a comment.

Leave a Reply