স্মার্টঘড়ি না স্মার্টব্যান্ড

প্রকাশিত

দিন দিন বাড়ছে স্মার্টঘড়ি ও স্মার্টফোনের ব্যবহার। মোবাইলে ঘড়ি থাকার পরও কেন ব্যবহার করা হচ্ছে এসব? এটা কি শুধুই স্টাইল নাকি নানা সুবিধাও আছে? জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

স্মার্টওয়াচ আর স্মার্টব্যান্ড এক নয়

 

দুটি ডিভাইসের মধ্যে পার্থক্য, যেখানে স্মার্টওয়াচ তৈরি করা হয়েছে কবজিতে থাকা ছোটখাটো কম্পিউটার হিসেবে, সেখানে স্মার্টব্যান্ডের দায়িত্ব শুধু ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা আর নোটিফিকেশন ও সময় দেখানো। এর ফলে স্মার্টব্যান্ডগুলো হয় হালকা-পাতলা, এসবের ব্যাটারিলাইফও অনেক। আর স্মার্টওয়াচ হয়ে থাকে বড়সড় ঘড়ির মতো, ব্যাটারিলাইফ সাধারণত দুই দিনের বেশি হয় না। তবে এ দুটির মাঝামাঝি ডিভাইসও আছে, যেগুলো অ্যানালগ বা ডিজিটাল ঘড়ি আর স্মার্টব্যান্ডের ফিচার—দুটি মিলিয়ে তৈরি। বাজারে কিছু স্মার্টওয়াচ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোকে ঠিক ওয়াচ না বলে কবজিতে পড়া যায় এমন ফিচারফোন বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

 

প্রতিটি স্মার্টওয়াচ বা ব্যান্ডই ব্লুটুথ যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে ফোনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তার মানে এ নয়, এগুলো একা একা কাজ করতে পারে না। তবে ফোনের সঙ্গে যুক্ত না করলে অনেকগুলো ফিচারই অকেজো রয়ে যায়। মূল্য ও প্রকারভেদে তাতে থাকতে পারে ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক সমর্থন, দেওয়া হতে পারে সিম কার্ডের মাধ্যমে ফোরজি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাও। কিছু কিছু স্মার্টওয়াচ শুধু ফোন নয়, তারহীন হেডফোনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গানও শোনাতে পারে।

 

কেনার আগে

স্মার্টওয়াচ বা ব্যান্ড কেনার আগে প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে, ঠিক কী ফিচারের জন্য কেনা হচ্ছে। যদি ব্যায়াম, স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা আর নোটিফিকেশন দেখাই মূল প্রয়োজন হয়, তাহলে ভালো মানের স্মার্টব্যান্ড কেনাই যথেষ্ট। আর প্রচুর ফিচার চাইলে অবশ্যই স্মার্টওয়াচ কেনা উচিত। আর যদি ফ্যাশনের সঙ্গে নোটিফিকেশন দেখা আর অল্পবিস্তর স্বাস্থ্য তথ্য দেখা লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে হাইব্রিড স্মার্টওয়াচ কেনাই বেশি কার্যকর।

স্মার্টওয়াচ বাজারে দুটি বড় অপারেটিং সিস্টেম রয়েছে। অ্যাপলেরটির নাম ‘ওয়াচওএস’, তাদের প্রতিটি ঘড়িই চলছে এই সিস্টেমের ওপর। আর গুগলেরটির নাম আগে ছিল ‘অ্যানড্রয়েড ওয়্যার’। তবে এ বছর তা বদলে করা হয়েছে ‘ওয়্যারওএস’। এ ছাড়া এসব স্মার্টওয়াচের জন্য আছে শাওমি আর স্যামসাংয়ের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম।

স্মার্টওয়াচ কেনার পর প্রথমেই এর জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপ ফোনে ডাউনলোড করে নিতে হবে। সাধারণত অ্যানড্রয়েড আর আইওএস, দুটি অপারেটিং সিস্টেমের জন্যই নির্মাতারা অ্যাপ তৈরি করে থাকে। তবে কেনার আগে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। অ্যাপ ইনস্টলের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীকে নিজেদের একটি অ্যাকাউন্ট করার জন্য অনুরোধ করা হবে, জানতে চাওয়া হবে তাঁর উচ্চতা, ওজন ও অন্য সব স্বাস্থ্যগত তথ্য। সেটি ব্যবহার করেই স্বাস্থ্যের ব্যাপারে রিপোর্ট তৈরি করা হবে। এরপর অ্যাপের মধ্য থেকেই স্মার্টওয়াচ বা ব্যান্ডটি ফোনের সঙ্গে পেয়ারিং বা সংযুক্ত করে নিতে হবে। এরপর অ্যাপ থেকেই নোটিফিকেশন দেখানো, ব্যায়ামের তথ্য, ব্যান্ড বা ওয়াচ আপডেট বা অন্যান্য কাজ করা যাবে।

 

 

দেশের বাজারের কিছু স্মার্টওয়াচ

 

অ্যাপল ওয়াচ

স্মার্টওয়াচ বাজারের বেশির ভাগই আছে অ্যাপলের দখলে। তাদের সর্বশেষ ঘড়িটির নাম ‘অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ৩’। শক্তিশালী হার্ডওয়্যার, বিবিধ ফিচার আর সহজ অপারেটিং সিস্টেমের জোরে সবার মন জয় করেছে এ ডিভাইস। অ্যাপ চালনা, হৃদস্পন্দন মাপা, জিপিএসের মাধ্যমে হাঁটা মাপা, ম্যাপের মাধ্যমে নেভিগেশন, নোটিফিকেশন দেখা, ফোন কল করা ও ধরা, মেসেজের উত্তর দেওয়া থেকে শুরু করে প্রচুর কাজ করা যাবে এতে। ডিজাইনেও অত্যন্ত ফ্যাশনেবল। ওয়াচটি ব্যবহার করতে সব সময় সঙ্গে ফোন থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই। সরাসরি সিমকার্ডের মাধ্যমে ফোরজি ডাটা ব্যবহার করতে পারবে এটি। শোনাতে পারবে মেমরিতে থাকা গান, চালাতে পারবে ভিডিও, দেখাতে পারবে ছবি। ব্যায়াম করা বা ট্রেকিং করার জন্য এটি বেশ কাজের। প্রয়োজনে এই ওয়াচ থেকেই ব্যবহার করা যাবে সিরি ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। সমস্যা একটিই, আইফোন ছাড়া এটি ব্যবহারের উপায় নেই। মূল্যও বেশ চড়া, প্রকারভেদে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার বা তারও বেশি।

 

হুয়াওয়ে ওয়াচ ২

‘ওয়্যারওএস’চালিত মাঝারি দামের ঘড়ি ‘হুয়াওয়ে ওয়াচ ২’। গোলাকার অ্যামোলেড ডিসপ্লে, স্ন্যাপড্রাগন কোয়াডকোর প্রসেসর আর যেকোনো সাধারণ হাতঘড়ির বেল্ট ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে। ওয়্যারওএস দেবে ইচ্ছামতো অ্যানড্রয়েড অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা। ব্যাটারি লাইফ খারাপ নয়। হৃদস্পন্দন মাপার সেন্সর, গতিবিধি লক্ষ রাখার জন্য জিপিএস, উচ্চতা মাপার জন্য ব্যারোমিটার—সবই আছে। তবে নেই সিম ব্যবহারের সুবিধা। শুধু ব্লুটুথ আর ওয়াই-ফাইর ওপরই নির্ভর করতে হবে। দাম ২১ হাজার টাকা।

 

শাওমি অ্যামেজফিট বিপ

ঠিক স্মার্টওয়াচও নয় আবার ব্যান্ডও নয় এমন ডিভাইস ‘অ্যামেজফিট বিপ’। বড়সড় ডিসপ্লে আছে। টাচ করে বিভিন্ন অপশনও নির্বাচন করা যাবে। হার্টরেট, ব্যায়ামের তথ্য, জিপিএসের মাধ্যমে দৌড়, হাঁটা বা সাইকেল চালানোর দূরত্ব দেখাসহ সব কিছুরই রেকর্ড রাখবে। নোটিফিকেশন দেখানো, অ্যালার্ম, ঘুমের দিকে নজর রাখা বা মেসেজের পুরোটাই স্ক্রিনে দেখানোর সব ফিচারই এতে আছে। ডিসপ্লে সব সময়ই চালু থাকবে, তার পরও ব্যাটারির লাইফ অন্তত এক সপ্তাহ। ফোনের সঙ্গে যুক্ত হবে ব্লুটুথের মাধ্যমে, অন্যান্য উপায় নেই। মূল্য সাড়ে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত।

 

স্কেমেই ১২২৭

ডিজিটাল হাতঘড়ির মধ্যেই কিছু স্মার্টব্যান্ড ফিচার যুক্ত করে বাজারে এসেছে স্কেমেইর বেশ কিছু মডেল। মূলত কিশোর বা তরুণদের জন্যই ডিজাইন করা ঘড়িগুলো বড়সড়, সামনের পুরোটা জুড়েই আছে সাদাকালো এলসিডি ডিসপ্লে। ফোনে কল বা মেসেজ এলে ছোট ইন্ডিকেটর ডিসপ্লেতে দেখা যায় এবং একই সঙ্গে ঘড়িটি ভাইব্রেট করে। অ্যালার্মের সঙ্গেও এটি ভাইব্রেট করবে। ডিভাইসটি খেয়াল রাখবে আপনার ঘুমের দিকেও। ব্যায়ামের তথ্যও রেকর্ড করবে। এই ঘড়ি দিয়ে ফোনের ক্যামেরাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। মূল্য ১৫০০ টাকা।

 

লেনোভো ওয়াচ ৯

তালিকার অন্য সব ঘড়ির চেয়ে এটি আলাদা। কারণ এতে নেই কোনো ধরনের ডিসপ্লে। অ্যানালগ, দৃষ্টিনন্দন ডায়াল ও কাঁটার মাধ্যমে সময় ও তারিখ জানিয়ে দেবে ‘ওয়াচ ৯’। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এতে কোনো ধরনের স্মার্টফিচার আছে কি না। ব্লুটুথের মাধ্যমে ফোনের অ্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত করার পর এটি বেশ কিছু কাজ করতে পারবে। ফোন বা মেসেজ এলে বিশেষ প্যাটার্নে ভাইব্রেট করা, ফোনের সঙ্গে নিজ থেকেই সময় ও তারিখ মিলিয়ে নেওয়া, অ্যালার্মের সঙ্গে ভাইব্রেট করা—সব কিছুই করবে। কত দূর হাঁটা বা দৌড়ানো হয়েছে, সেটি খেয়াল রাখতে পারবে। ঘড়িটি ক্যামেরার রিমোট শাটার হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। ব্যাটারি লাইফ প্রায় এক বছর। তবে ছয় মাস পর পর ব্যাটারি বদলাতে হবে ধরে রাখাই ভালো। সাধারণ ঘড়ির ব্যাটারিতে চলবে। মূল্য তিন হাজার টাকা।

 

আছে ব্যান্ডও

দেশের বাজারে ব্যান্ডের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে শাওমির মি ব্যান্ড। কিছুদিন হলো ‘শাওমি মি ব্যান্ড ৩’ বাজারে এসেছে।

শাওমির জনপ্রিয় স্মার্টব্যান্ডটির মূল্য মাত্র তিন হাজার টাকা। অন্তত দুই সপ্তাহ ব্যাটারি লাইফ, নির্ভুল হার্টরেট সেন্সর আর নোটিফিকেশন দেখার সুযোগের কারণে সমাদৃত এটি। ঘড়ির কাজ, ঘুমের তথ্য, ব্যায়ামের তথ্য, হাঁটা-চলার পরিমাণ খেয়াল রাখবে। ফোন কিংবা মেসেজ এলে ভাইব্রেট করে নোটিফিকেশন করবে। অত্যন্ত ছোট এই ডিভাইস হাতে পরা অবস্থায় খেয়ালও থাকবে না তা আছে কি নেই। ব্যান্ডটির জন্য শিগগিরই বাজারে বাহারি সব চেইন পাওয়া যাবে।