হলুদের ঢেউ থামাল বেলজিয়াম

প্রকাশিত

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ইনজুরি টাইম। দগলাস কস্তার ভাসিয়ে দেওয়া বলে শরীর ভাসিয়ে উঠলেন তিনি হেড করার জন্য। বেলজিয়ান ডিফেন্ডার থমাস মিউনিয়েরের খানিক স্পর্শে পড়ে যান। আবেদন পেনাল্টির। সেটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কী অবিশ্বাস নেইমারের চোখে-মুখে!

ম্যাচের ফলের প্রতিফলন যাতে। ফেভারিট হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করা ব্রাজিল যে কাল কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে গেল ১-২ গোলে! দিনকয়েক আগে এই কাজান এরেনার সবুজে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পোড়ে আর্জেন্টিনা। কাল সেই একই মঞ্চে স্বপ্নঘুড়ি ভোকাট্টা ব্রাজিলেরও। আকাশি-সাদার পর বিশ্বকাপের রংধুন থেকে ব্রাজিলের হলুদ রংও খসে পড়ল তাই!

আদেনর বাক্কি তিতের অধীনে এর আগে ২৫টি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। ১৯ ম্যাচে তো কোনো গোলই খায়নি; বাকি ছয় ম্যাচের কোনোটিতে একটির বেশি নয়। সেই তাঁরা কি না কাল প্রথমার্ধেই খেয়ে গেল দুই গোল! দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমে রেনাতো অগুস্তো ৭৬তম মিনিটে এক গোল শোধ করেন বটে; কিন্তু সমতায় আর ফিরতে পারেনি। অঘটনের বিশ্বকাপের সর্বশেষ সংযোজন হয়ে থাকে ব্রাজিলের কান্না।

অথচ ম্যাচের শুরুটা কী দারুণভাবেই না করেছিল তিতের দল। গোল পেয়ে যেতে পারত ম্যাচের অষ্টম মিনিটে। নেইমারের কর্নার থেকে উড়ে আসা বল মিরান্দার মাথায় স্পর্শ করে খানিকটা। গিয়ে পড়ে পেছনে থাকা থিয়াগো সিলভার থাইয়ে। আচমকা তা আসায় বলের গতিপথ ঠিক করে দিতে পারেননি। বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়াকে টপকে বল চলে যায়, তবে তা প্রতিহত পোস্টে। মিনিট দুয়েক পর আরেকটি কর্নার থেকে পাউলিনিয়ো বক্সের মধ্যে বল পেয়ে যান একেবারে ফাঁকায়। কিন্তু ওই চর্মগোলকের সঙ্গে পায়ের সংযোগ করতে পারেন না ঠিকঠাক।

খেলার ধারার বিপরীতে ১৪তম মিনিটে এগিয়ে যায় বেলজিয়াম। এডেন হ্যাজার্ডের কর্নারে প্রথম পোস্টে ফের্নান্দিনিয়োর হাতে লেগে বল ঢুকে যায় জালে। অথচ তাঁর ধারেকাছে কোনো লাল জার্সিধারী নেই। অবিশ্বাস্য এই আত্মঘাতী গোলের পরও আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল ব্রাজিলকে। তাঁদের পাসিংয়ে, তাঁদের আক্রমণ তৈরি করায়। গোল খাওয়ার পরের মিনিটেই সমতায় ফেরার সুযোগ এসেছিল। বাঁ দিকে নেইমার ড্রিবলিং করে বেরিয়ে গিয়ে বল পাঠান ছয় গজের বক্সে। তাতে ঠিকঠাক শট নিতে পারেন না গাব্রিয়েল জেসুস। খানিক পর ফিলিপে কৌতিনিয়োর শট ঠেকান কোর্তোয়া।

কিন্তু প্রথম গোল দেওয়ার বিশ্বাস ছড়িয়ে যায় বেলজিয়ামের খেলাতেও। হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনেরা কাঁপন ছড়ান ব্রাজিল রক্ষণভাগে। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে জমে ওঠে খেলা। এদিকে মার্সেলোর শটে কোর্তোয়াকে সজাগ থাকতে হয়; ওদিকে ডি ব্রুইনের ক্রসে থিয়াগো সিলভাকে। এরই মধ্যে ৩১তম মিনিটে দ্বিতীয় গোল বের করে নেয় বেলজিয়াম। আর কী অসাধারণ কাউন্টার অ্যাটাকে! নেইমারের কর্নার ক্লিয়ার করেন ফেলাইনি। নিজেদের সীমা থেকে বল ধরে লুকাকুর এক জাদুকরী দৌড়। অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে চমৎকার পাস ছাড়েন ডি ব্রুইনেকে। সামনে থাকা মার্সেলোকে গোনায় না ধরে আড়াআড়ি দারুণ শটে বল জড়িয়ে দেন জালে।

দুই গোল খেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়ে ব্রাজিল। তাদের দানবীয় রক্ষণভাগ হঠাৎই মনে হয় ঠুনকো। বেলজিয়াম আক্রমণে উঠলেই হয়তো গেলবারের স্মৃতি হানা দিচ্ছিল মনে। জার্মানির কাছে ১-৭ গোলে হারের। এর মধ্যেও গোলের দারুণ দুটো সুযোগ পায় ব্রাজিল। কিন্তু মার্সেলোর ক্রসে বক্সের ভেতর ফাঁকায় পেয়েও হেডে বল বাইরে মেরে দেন জেসুস। আরেকবার কৌতিনিয়োর শট ঠেকান কোর্তোয়া।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে উইলিয়ানের বদলে রবার্তো ফিরমিনোকে পাঠান তিতে। ৫৮ মিনিটে জেসুসের বদলে দগলাস কস্তা। আর ৭২তম মিনিটে পাউলিনিয়োর বদলে রেনাতো অগুস্তো। এই শেষজনই মাঠে নামার মিনিট চারেকের মধ্যে একটু স্বপ্ন দেখান ব্রাজিলকে। কৌতিনিয়োর দারুণ বলে হেডে গোল করে। বাকি সময়টায় সমতায় ফেরার সুযোগ বেশ কয়েকবারই পায় তাঁরা। কিন্তু সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে তো! ৭৮তম মিনিটে নেইমারের পাস থেকে ফিরমিনো টার্ন নিয়েও শট মারেন বার উঁচিয়ে। ৮০তম মিনিটে বক্সের ভেতরে ফাঁকা জায়গা থেকে কী করে যে শটটি বাইরে মারেন অগুস্তো! মিনিট তিনেক পর নেইমারের কাটব্যাক থেকে অমন ফাঁকা জায়গা থেকে আবারও ব্যর্থ কৌতিনিয়ো।

ওদিকে বেলজিয়ামও ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার সুযোগ পায় বেশ কয়েকটি। প্রয়োজন পড়েনি। ব্রাজিল তো আর কোনো গোলই করতে পারেনি! বাজিকরদের ‘কালো ঘোড়া’ বেলজিয়ামের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তাই টিকে রইল।

আর রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে নেইমারের মুখ ঢেকে কান্না, মার্সেলো-সিলভাদের মুষড়ে পড়ার ছবিটাই হয়ে থাকল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতীক। চার বছর আগে জার্মানির কাছে ১-৭ গোলের হারের পরের মতো। কাজান এরেনার ক্যানভাসে আরো একটি বিষণ্নতার ছবি আঁকা হলো কেবল।