ওপারে ভালো থেকো “মা”

প্রকাশিত
মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন-প্রিয় মা, তোমাকে উদ্দেশ্য করে কোনদিন লিখেছি কিনা আজ আর মনে করে বলতে পারিনা। মনে করতে পারিনা তোমার জন্যে কতগুলো শব্দকে মস্তিষ্ক থেকে কাগজে স্থানান্তর করেছি। তাতে কি হয়েছে? তোমার উপর অমরতা আমার  অধিকার, আজ লিখব! নিঃশ্বাস কোন মুহূর্তে নেওয়া শুরু করেছি, তাও তো মনে নেই আমার… শ্বাস নেওয়া তো থামিয়ে দেইনি।
“মায়ের গায়ে একটা গন্ধ থাকে ,ঘামে ভেজা
হোক কিংবা কোনো সুগন্ধির ;
সুনির্দিষ্ট একটা ঘ্রাণ।
শুধু সন্তানরাই সে গন্ধ পায়।”
মা তোমার গায়ের গন্ধটা আমি যে কোথাও খুজে পাই না!
তুমি জেনে থাকবে, কোন মুহূর্তে প্রথম প্রাণ বায়ুটি নিজেতে নিয়েছিলাম। তুমি জেনে থাকবে, আমি প্রথম কখন কেঁদেছি, কিভাবে?
এই পৃথিবীতে সব থেকে প্রথম তুমি আমায় ভালবেসেছো। আমি যখন সবুজ দেখিনি, অবুঝ কাঁদিনি, তারও আগে থেকে লালন করেছো মমতায়, আমার তরে।
শত-কোটিবার তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, এটা কোথায়, ওটা কোথায়, এমন কেন?… তুমি অবিরাম উত্তর দিয়ে গেছ … বিনা প্রতিবাদে। আমার প্রতিটি জিনিসের এনসাইক্লোপিডিয়া যেন তুমি! আমার পছন্দের জিনিসটি কবে আমার লাগবে আমার তা জানা নেই, তুমি কিভাবে যেন ঠিকই জান। তুমি হচ্ছ সেই মানুষ, যে আমার থেকেও আমাকে বেশী চিনতে। আমার মন খারাপ দেখে তোমাকে দুঃখ পেতে দেখেছি… আমাকে রেগে থাকতে দেখে তোমাকে কাঁদতে দেখেছি। আমার অসুখ-বিসুখে তোমাকে পাশে পেয়েছি ঘণ্টার পরে ঘণ্টা। যখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি আমার জন্যে ব্যয় করেছ সময়,শ্রম। আমি কৃতজ্ঞ কেঁদে চোখের পানি লুকিয়েছি কতবার সে হয়তো শুধু  মহান সৃষ্টিকর্তা জানেন।
ছোটবেলায় যখন বুঝে-না বুঝে বাজে কোনো অন্যায় করে ফেলতাম, মা এসে দুমধাম করে দুই-চার ঘা লাগিয়ে দিতেন। ব্যস ফুরিয়ে যেত। কিন্তু ভেতরটা ফালাফালা হয়ে যেত যখন মা কোনো কিছু না বলে গম্ভীর মুখে ঘুরে বেড়াতেন, দূরে দূরে থাকতেন, কাছে ঘেঁষতে চাইলেও পাত্তা দিতেন না।
বুঝতে পারতাম যে এবারের অপরাধটা মায়ের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেছে, মাকে হয়তো খুব আঘাত দিয়ে ফেলেছি। মা কষ্ট পাচ্ছেন আমার জন্য এ কথা মনে এলেই বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেত। আঁচল ধরে মায়ের পেছনে পেছনে ঘুরতাম, ঘ্যান ঘ্যান করে মাফ চাইতাম…মা ও মা আর করবো না, মাফ করে দাও, সত্যি বলছি আর ভুল হবে না কোনোদিন। অভিমান অল্প হলে মা মাফ করে দিতেন, কোলে তুলে নিতেন।
আমি আবার নিশ্চিন্ত হয়ে উড়ে যেতাম খেলার সাথীদের মাঝে। অভিমান খুব কড়া হলে, মা তখনও মুখ ফিরিয়ে থাকতেন, দু’একবার ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিতেন। আমিও নাছোড়বান্দার মতো মায়ের পিছুপিছু যেতাম রান্নাঘরে, কলতলায়, মা যেদিকে যেতেন সেদিকেই।
তোমার শাসনের প্রতিটি শব্দ যে কতটা মুল্যবান আজ বুঝতে পারি কিছুটা… প্রতিটি শব্দ ছিল আমার কল্যাণে। আমার ভালোর জন্যে। সব সব সব আমার! তোমার কি মা? আমিও কি তোমার হতে পারলাম বল? নিয়মের নিষ্ঠুরটায় তোমার বাঁধন ছিঁড়ে এসে পড়েছি দেখ।
কত বেশি ভালবেসেছ মা? আমি তো তোমায় এতো ভালবাসতে পারিনি! তোমার অসুখে সেবা করিনি রাত জেগে, কষ্ট দিয়েছি, অনেক অনেক কষ্ট দিয়েছি। মা তুমি যখন একদিন হঠাৎ বললে তুমার বুকে ব্যাথা করছে। প্রথমে শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম কি করব বুঝতে পারছিলাম না।  তোমাকে রাত দুইটার সময় ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসি। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছিল প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল।  হয়তোবা আমার জন্য বেশি চিন্তা করতে তাই এরকমটা হয়েছিল।  এমনি করে একটু একটু অসুস্থতার মধ্য দিয়ে বছর দুয়েক কেটে গেল।  একদিন হঠাৎ তুমি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে।  আমি তখন ছুটে গেলাম কক্সবাজার থেকে তোমাকে দেখতে।  সাথে নিয়েছিলাম কিছু আনার(ফ্রুটস) ।  তোমাকে খেতে দেওয়া মাত্রই তুমি রক্ত বমি করলে।  কিন্তু কেন যে রক্ত বমি করলে আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না।  আমাদের আত্মীয় স্বজন সবাই খুব বেশি কান্নাকাটি করতে লাগলো তোমার পাশে বসে সবাই এমন ভাবে কান্নাকাটি করতেছে যেন তুমি আর নেই!  আমিও খুব বেশি কান্নাকাটি করতেছিলাম কিন্তু হতবুদ্ধি হারা হয়ে যায়নি।  তোমাকে সাথে সাথে নিয়ে আসি কক্সবাজার আল ফুয়াদ হাসপাতাল রমজান ভাইয়ের মাধ্যমে।  তখন কর্মরত ছিলেন ডাক্তার ইমরান।  ইমরান ভাই আমাকে বলল ভাই যত দ্রুত সম্ভব তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যান।  অ্যাম্বুলেন্সে করে তোমাকে সাথে সাথে নিয়ে গেলাম চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল।  সেখানে নয়ন দা এবং চয়ন আমাদের এত বেশি সহযোগিতা করেছিল যে গুলো কখনোই ভুলার মত না।  সরওয়ার ভাই না থাকলে চট্টগ্রাম চিকিৎসা করাটা অসম্ভব হয়ে পড়তো প্রায় । তোমাকে মেডিসিন বিভাগে রাখা হয়েছিল তিন দিন।  আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না তুমি কিছু বলছিলে  না কেন? একটি সপ্তাহ কেটে গেল তুমি কিছুই খাওনি।  অমনি করে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরে ডাক্তার বুঝতে পারল তোমার কিডনি ডেমেজ হয়ে গিয়েছিল।  ডাক্তার আমাকে তার রুমে ডেকে বুঝিয়ে বলল……..  কিন্তু ততোদিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল!  কিন্তু তখন অনেক প্রচেষ্টার পরে ১৮ দিন শেষে তুমি একটু সুস্থ হলে। কিন্তু তুমাকে ডায়ালাইসিস করাতে হবে সপ্তাহে ২ দিন। অনেক টাকা আর সময়ের প্রয়োজন ছিল। আমি ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করেছিলাম আমার কিডনি চেঞ্জ করা যাবে কি না? ডাক্তার বলেছিল মায়ের হার্টের অবস্থা ততোটা ভালো না।  তাই কিডনি রিপ্লেস করার চাইতে ডায়ালাইসিস করে বেঁচে থাকাটা অনেক বেশি উত্তম হবে। এভাবেই চলতে থাকে হাসপাতাল -আমি -তুমি -ভাইয়া-ভাবি।  প্রত্যেক মাসে দুই ব্যাগ করে রক্ত দেওয়া।  তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া হাসপাতালের বেডে তুমি আর আমি শুয়ে থাকা।  এভাবেই কেটে গেল আমার ইন্টারমিডিয়েট এর পুরোটা ২ বছর। আস্তে আস্তে তুমার  অসুস্থতা আরো বেড়ে গেল।  তুমি বলতে বাবা আমি মনে হয় আর বেশি দিন বাঁচবো না তুই আমাকে দেখতে আয়।  দিনের পর দিন ঘন্টার পর ঘন্টা প্রত্যেকটা মিনিট প্রত্যেকটা মুহূর্তে তুমি আমাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করতে ভাত খেয়েছিস কিনা কি করতেছ এখন কি অবস্থা? কিন্তু একদিন তুমি খুব বেশি অসুস্থতা বোধ করলে তোমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।  সেখানে তোমাকে অপারেশন দেওয়া হয়।  দুর্ভাগ্য হলেও সত্য এই যে,  তোমার সাথে সেই শেষবার আমার যাওয়া হলো না চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে।  মেডিকেলের প্রত্যেকটা ডাক্তার, প্রত্যেকটা নার্স বিশেষ করে ২২ নম্বর সিটটা আম্মু আমার, আমার আত্মীয়-স্বজনের সকলের খুব বেশি পরিচিত ছিল।  আহারে জীবন! এমনি করে ৬ নভেম্বর সকাল দশটার দিকে ভাইয়া ফোন দিয়ে বলল তোকে আম্মু খুব বেশি দেখতে চাচ্ছে।  আমি বললাম ঠিক আছে আমি আজকে আসবো।  টিক তার দশ মিনিট পরে ভাইয়া আবার ফোন দিয়ে বলল মা আর নেই! পুরো পৃথিবীটাই যেন আমার মাথার উপর ভার করেছিল। মা হয়তো আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল।  না হয় তোমাকে এভাবে আমরা কখনোই হারাতাম না। মা আমাদের সকলকে তুমি ক্ষমা করে দিও।  হ্যাঁ মা আব্বু অনেক বেশি ভালো আছে ৷ তোমার হাতে গড়া দুটি সন্তান আছে তো। আমাদের সকলের জন্য দোয়া করো।  তোমাকে ছাড়া খুব একা লাগে। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করবেন। আল্লাহর কাছে আমরা দোয়া করি, ভাল থেকো মা।
“মা গো এমন হয়না কেন
ছোট্ট দাঁড়ের বুলবুলিটি যেন
ভোরবেলা রোজ মিষ্টি সুরে
ফুল ফোটানোর মত
ঘুমটি আমায় ভাঙিয়ে দিতে সোহাগ ভরে কত
চোখটি মেলে খুঁজলে আমায় শিস দিতাম তখনোত
একটা আঙুলের ছোয়ায় সব বাধা পার
এক আঁচলের পালিশ সারা পৃথিবী পরিষ্কার
খেয়েছিস? এত দেরি কেন হল? খবর কে নেবে আর ?
মায়ের হাতের শুকনো মুড়ি হার মানে পোলাও লুচি, তোমার পায়ের ধুলো মাগো
ধুলো নয়তো হীরের কুচি।
লেখক,মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
শিক্ষার্থী অনার্স ২ বর্ষ কক্সবাজার সরকারি কলেজ, ব্যবসা  অনুষদ।